এলোমেলো জীবনsteemCreated with Sketch.

96b19e2539a04f4c9717a9ef2903b705.jpeg

জীবন চলছে তার নিজস্ব গতিতে। এ জীবনে চাওয়া পাওয়ার অনেক কিছুই থাকে। কত যুবক কত যুবতি তাদের ইচ্ছেগুলো পূরণ করা ছাড়াই ত্যাগ করতে হয় তাদেরকে এই জগত।
এ জীবন বড় অদ্ভুত। হাসি কান্না সুখ-দুঃখ মিশ্রিত এ জীবন। কেউ ছুটে চলেছে তার লক্ষ্য পূরণের জন্য। আবার কেউ বা ছুটে চলেছে উদ্দেশ্যহীনভাবে।

মানুষের চাওয়া পাওয়ার কোন শেষ নেই।

এমনই এক উদ্দেশ্যহীন পথিক ছিল রাকিব। বয়স তেইশ। লালমনিরহাটের এক ছোট গ্রামে তার জন্ম। বাবা ছিলেন সামান্য কৃষক, মা গৃহিণী। ছোট বোন মিতুকে নিয়ে চারজনের সংসার। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু ভালোবাসার কমতি ছিল না কখনো।

রাকিব ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিল। স্কুলের শিক্ষকরা বলতেন, "এই ছেলেটা একদিন অনেক বড় হবে।" সেই কথাগুলো শুনে বাবার চোখ চকচক করে উঠত। বাবা ভাবতেন, তাঁর ছেলে হয়তো একদিন তাঁদের দুঃখের দিন শেষ করে দেবে। রাকিবও স্বপ্ন দেখত। সে বড় চাকরি করবে, মায়ের জন্য পাকা বাড়ি বানাবে, বোনকে ভালো স্কুলে পড়াবে।

কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে যে দূরত্ব, তা পেরোনো সহজ নয়।

এইচএসসি পাস করার পর রাকিব ভর্তি হলো জেলা শহরের একটি কলেজে। প্রতিদিন ভোরে উঠে বাসে চড়ে যেত, ফিরত সন্ধ্যায়। বাবার সামান্য আয়ে তার পড়ার খরচ জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠছিল। তবু বাবা কখনো মুখ ফুটে বলতেন না। রাকিব নিজেই বুঝে নিত। সে টিউশনি শুরু করল, দুটো ছেলেকে পড়াত, মাসে তিন হাজার টাকা পেত। তার অর্ধেক দিত মায়ের হাতে, বাকিটা নিজের খরচে।

দিন কাটছিল এভাবেই। তারপর একদিন সবকিছু বদলে গেল।

সেদিন ছিল বর্ষার এক বিকেল। আকাশ কালো করে মেঘ জমেছিল। রাকিব কলেজ থেকে ফিরছিল, হঠাৎ ফোন বাজল। মিতুর কান্নাভেজা কণ্ঠ, "ভাইয়া, তাড়াতাড়ি আসো। বাবা মাঠে পড়ে গেছেন।"

রাকিব কীভাবে বাড়ি পৌঁছেছিল, তার মনে নেই। উপজেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখল বাবা শুয়ে আছেন, চোখ বন্ধ। ডাক্তার বললেন স্ট্রোক হয়েছে, দ্রুত শহরের বড় হাসপাতালে নিতে হবে। টাকার অঙ্ক শুনে রাকিবের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। মা কাঁদতে কাঁদতে গলার একমাত্র সোনার চেইনটা খুলে দিলেন। প্রতিবেশীরা যে যা পারল সাহায্য করল।

বাবা বেঁচে গেলেন, কিন্তু তাঁর শরীরের একটা দিক অবশ হয়ে রইল। যে মানুষটা সারাজীবন মাঠে হাল চষেছেন, তিনি এখন বিছানায় বন্দি। সংসারের সব ভার এসে পড়ল রাকিবের কাঁধে।

কলেজ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে তার বেশি সময় লাগেনি। রাতে বিছানায় শুয়ে সে নিঃশব্দে কেঁদেছিল। যে স্বপ্ন সে এতদিন বুকে আগলে রেখেছিল, তা এক রাতেই ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল। মা জানতে পেরে বললেন, "বাবা, তুই পড়া ছাড়িস না।" রাকিব হেসে বলেছিল, "মা, পড়া তো পরেও করা যাবে। আগে বাবার চিকিৎসা।"

সে কাজ খুঁজতে শুরু করল। গ্রামে কাজ নেই, শহরে গেলে থাকার খরচ। শেষে ঢাকায় এক দূর সম্পর্কের মামার কাছে গেল। মামা একটা গার্মেন্টসে কাজ জুটিয়ে দিলেন। সেখানে সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত খাটুনি। মাস শেষে বেতন যা পেত, তার বেশিরভাগই বাড়িতে পাঠিয়ে দিত।

ঢাকা শহর তাকে অনেক কিছু শেখাল। এখানে কেউ কারো দিকে তাকায় না। সবাই ছুটছে, কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, কেউ জানে না। রাকিব দেখত তার মতো হাজারো তরুণ, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল, এখন ক্লান্ত দেহে ঘরে ফেরে। কারো স্বপ্ন হারিয়ে গেছে, কেউ আবার স্বপ্ন দেখতেই ভুলে গেছে।

একদিন রাতে ছাদে বসে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। পাশে বসেছিল সহকর্মী করিম, বয়সে কিছুটা বড়। করিম জিজ্ঞেস করল, "কী ভাবছ রাকিব?"

"ভাবছি, আমি কি ঠিক পথে আছি?"

করিম একটু হাসল। "ঠিক পথ বলে কিছু নেই ভাই। যে পথে হাঁটছ, সেটাই তোমার পথ। তবে একটা কথা মনে রেখো, থেমে গেলে হারিয়ে যাবে। হাঁটতে থাকলে অন্তত কোথাও না কোথাও পৌঁছাবে।"

কথাটা রাকিবের মনে গেঁথে গেল।

সেদিন থেকে সে নিজের জন্য একটা নিয়ম করল। দিনের কাজ শেষে রাতে অন্তত এক ঘণ্টা পড়বে। ফুটপাত থেকে পুরনো বই কিনত, মোবাইলে অনলাইন ক্লাস দেখত। কম্পিউটারের প্রতি তার আগ্রহ ছিল বরাবরই। ধীরে ধীরে সে শিখতে লাগল। প্রথমে সাধারণ অফিসের কাজ, তারপর গ্রাফিক ডিজাইন, তারপর ওয়েবসাইট বানানো। রাত জেগে শেখা, ভুল করা, আবার শেখা। এভাবে কেটে গেল দুই বছর।

এর মধ্যে বাবার শরীর অনেকটা ভালো হয়েছে। লাঠিতে ভর দিয়ে উঠোনে হাঁটতে পারেন। মিতু এসএসসি পাস করেছে, গ্রামের সবাই তার প্রশংসা করে। মা প্রতি ফোনে একই কথা বলেন, "বাবা, নিজের যত্ন নিস।"

একদিন রাকিব সাহস করে গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দিল। সবাই বলল সে পাগল হয়েছে। নিশ্চিত আয় ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে যাচ্ছে। কিন্তু সে জানত, এই সিদ্ধান্ত না নিলে সারাজীবন একই জায়গায় আটকে থাকবে। অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করল। প্রথম তিন মাস একটা কাজও পেল না। হতাশা ঘিরে ধরল তাকে। কয়েকবার ভাবল সব ছেড়ে আবার কারখানায় ফিরে যাবে।

কিন্তু প্রতিবার করিমের কথা মনে পড়ত। থেমে গেলে হারিয়ে যাবে।

চতুর্থ মাসে এল প্রথম কাজ। ছোট একটা লোগো ডিজাইন, মাত্র পাঁচ ডলার। সেই পাঁচ ডলার হাতে নিয়ে রাকিব এমনভাবে হেসেছিল, যেমন হাসি সে বহুদিন হাসেনি। তারপর ধীরে ধীরে কাজ আসতে শুরু করল। একজন ক্লায়েন্ট থেকে আরেকজন, ভালো রিভিউ থেকে আরও ভালো কাজ।

তিন বছর পর রাকিব নিজের ছোট একটা টিম গড়ে তুলল। কয়েকজন তরুণকে কাজ শেখাত, যারা তারই মতো স্বপ্ন নিয়ে শহরে এসেছিল। করিমও তার সঙ্গে যোগ দিল। যে মানুষটা একদিন ছাদে বসে তাকে পথ দেখিয়েছিল, আজ সে তার পাশে দাঁড়িয়ে।

একবার ঈদের ছুটিতে রাকিব গ্রামে ফিরল। বাবা উঠোনে বসে ছিলেন। ছেলেকে দেখে তাঁর চোখ ভিজে উঠল। রাকিব বাবার পাশে বসে হাত ধরল। বাবা বললেন, "তুই আমার চেয়ে অনেক বড় হয়েছিস রে।"

রাকিব মাথা নাড়ল। "না বাবা, আমি শুধু হাঁটা থামাইনি।"

সেই রাতে সে ছাদে উঠে আকাশের দিকে তাকাল। গ্রামের আকাশে তারা অনেক বেশি স্পষ্ট। সে ভাবল, জীবন সত্যিই এলোমেলো। কোনো হিসাব মেলে না, কোনো পরিকল্পনা ঠিক থাকে না। যা চেয়েছিল তা পুরোপুরি পায়নি, আবার যা পেয়েছে তা কখনো চায়নি। তবু এই এলোমেলো পথ ধরেই সে আজ এখানে।

কত মানুষ স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই বিদায় নেয়। কেউ হয়তো সুযোগ পায় না, কেউ হয়তো সাহস পায় না। রাকিব জানে, সে ভাগ্যবান। কিন্তু সে এও জানে, ভাগ্য শুধু দরজা খুলে দেয়, হেঁটে ভেতরে ঢুকতে হয় নিজেকেই।

মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই, এ কথা সত্য। কিন্তু এই না-ফুরানো চাওয়াই তো মানুষকে চলতে শেখায়। যেদিন চাওয়া থেমে যায়, সেদিন জীবনও থেমে যায়।

ভোরের আলো ফুটতেই রাকিব নিচে নামল। মা রান্নাঘরে চা বানাচ্ছেন, মিতু পাশে বসে বই পড়ছে। বাবা লাঠি হাতে উঠোনে হাঁটছেন। এই দৃশ্যটুকুই তার সব পাওয়া।

জীবন এলোমেলোই থাকবে। তবু প্রতিটি এলোমেলো মুহূর্তের মাঝেই লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট সুন্দর গল্প। শুধু চোখ মেলে দেখতে জানতে হয়।

সমাপ্ত