হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ, ইমারতের মাঝে!

যখন ছোট ছিলাম, তখন শহর আর গ্রামের প্রাকৃতিক চিত্রের মধ্যে ছিল বিস্তর পার্থক্য!
তবে, এখন যদি পিছনের অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমানের শহর এবং গ্রামের তুলনা করি, সেক্ষেত্রে বিশেষ পার্থক্য নজরে পড়ে না!
কেনো এমনটা বলছি, তার জীবন্ত উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরতে পারি, আমার শৈশবের গরমের ছুটির সেই জায়গা অর্থাৎ আমার মেজো মাসীর বাড়ি যেখানে অবস্থিত।
এখনের সাথে শৈশবে অতিবাহিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য নজরে পড়েছিল, যেদিন পুজোর কারণে আমি গিয়েছিলাম নতুন প্রজেক্টের জায়গায়।

ওই জায়গাটির নাম তেঁতুল তলা! নামকরণের পিছনের কারন নিশ্চই অনুমান করতে পারছেন!
আমার মেজো মাসীর বাড়ি থেকে বড় মাসীর বাড়িতে সেই সময় হেঁটেই যেতাম, মায়ের সাথে আর সমস্ত ভাই বোনদের সাথে!
তখন রাস্তায় এই জায়গাটি পড়তো, আর আমরা যারা ছোট ছিলাম, তাদের নজর থাকতো বিশালাকার তেঁতুল গাছের গোড়ায়! যদি পাকা তেঁতুল পাওয়া যায়, তাহলে তো কথাই নেই!
আমাদের উদ্দেশ্য মা বেশ ভালো বুঝতে পারত, তাই আমাদের ভয় দেখাতো এই বলে, তেঁতুল গাছে ভূত থাকে, কিন্তু জীবন্ত পেত্নী আর ভূতেদের মাঝে ওই তেঁতুল গাছের ভূত কতক্ষন আর টিকবে!
তাই, বড় মাসীর বাড়িতে যাওয়ার পথেই সমস্ত প্ল্যান পাকা হয়ে যেতো, পরের দিন দিনের বেলায় কখন সকলে ওই তেঁতুল তলায় জমায়েত হবো।
এবার পুজোর দিন গিয়ে বুঝলাম, জায়গার নাম অপরিবর্তিত রয়েছে বটে, কিন্তু নেই তখনকার চিত্র, সেখানে থাবা বসিয়েছে একাধিক গজিয়ে ওঠা ইমারত।

এমনকি, যখন ব্যাংকের কাজ করছিলাম ওইদিন, ব্যাংকের ভিতরে ঠিক আমাদের পাশের চেয়ারে বসে একটি লোক বলছিলেন, যে জায়গায় পজেক্ট করেছে আমার কাজিন, সেই জমি আগে ওনাদের ছিল।
তারপর, নজর ফিরিয়ে আমার কাজিনকে দেখতে পেয়ে হেসে জানিয়েছিল, ওনার কাছ থেকেই জমিতা কাজিনরা কিনেছিলেন কথাটি সঠিক।
এই রকম কত নতুন নতুন বাড়ি নজরে পড়লো, যখন ছাদে উঠে বেশ কিছু ছবি ওইদিন তুলেছিলাম।
স্মৃতির পাতায় রয়ে যায় মুহুর্ত, রয়ে যায় হারিয়ে যাওয়া মানুষ, আর পরিবর্তিত হয় পরিবেশ, পরিস্থিতি!

ওইদিন ঠিক এই ভাবনাটাই মাথায় এসেছিল। উন্নত হচ্ছে শহর থেকে গ্রাম, আর বিলীন হয়ে যাচ্ছে সবুজ!
কংক্রিটের কাছে হার মানতে খানিক বাধ্য হচ্ছে প্রকৃতি।
এ বছর আমার কাজিনের সাথে কথা বলে বুঝলাম, এই ভৌগোলিক পরিবর্তন এর জন্য বৃষ্টির হার এ বছর অনেকখানি কমে গিয়েছে, ফলত বৃদ্ধি পেয়েছে তাপমাত্রা।

যখন ছোট ছিলাম, তখন গ্রামে কখনও শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি, প্রকৃতির বিশুদ্ধ বাতাস যথেষ্ট ছিল গ্রীষ্মের সাথে মোকাবিলা করবার জন্য।
আর সেই জায়গায় আজ বসেছে একাধিক শীত তাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র!
এখন চলতে চলতে কারোর নজর তেঁতুল গাছ খোঁজে না, কারোর আগ্রহ নেই তেঁতুল গাছের নিচে পাকা তেঁতুল পাওয়া যাবে কিনা!
এর অন্যতম কারণ, আজ অনেকেই পায় হেঁটে একসাথে পথ চলে না! আজ সকলেই এত ব্যস্ত যে, কে কাকে ছড়িয়ে কতখানি এগিয়ে যাবে, সেই ভাবনায় অধিক ভাবিত।
এরপর, হয়তো প্রায় যাওয়া পড়বে সেই শৈশবের তেঁতুল তলায়, জানিনা সেই ভূতেরা আজ কোথায় আশ্রয় নিয়েছে! দেখা হলে একবার নিশ্চই জিজ্ঞাসা করবো কি তাদের বর্তমান পরিস্থিতি আর ভবিষ্যত নিয়েই বা কি ভাবনা তাদের! ওই ছোট খাটো ইন্টারভিউ বলতে পারেন!
আজ তারা ভূত হলেও, একদিন তো মানুষ ছিল! কাজেই, কেউ যে তাদের খবর নিচ্ছে এই বা কম কি?
কি তাই না বলুন?


