জটিলতা সম্পন্ন অতীত।
আসুন, অতীত জেনে আসি।
আপনার যদি ধৈর্য থাকে, তাহলে একটু সময় নিয়ে উপলব্ধি করে লেখাটা পড়তে পারেন। আর যদি সময় না থাকে, তাহলে পড়ার দরকার নেই।
ঘটনাটা ২০১৬ সালের শেষের দিকে, নতুবা ২০১৭ সালের শুরুর দিকের।
ডাক্তার শরীফুল ইসলাম সুমন ভাইকে তো গোবিন্দগঞ্জবাসী চেনেন। বর্তমান সময়ে হয়তো তাকে আরও বেশি মানুষ চেনেন,বিশেষ করে পুরাতন বন্দরের ছোট ভাই অনন্ত রায়ের চিকিৎসার সময় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে তার মানবিক ভূমিকার কারণে।
তবে সত্যি কথা হলো, ভদ্রলোক তার পেশাজীবনের শুরু থেকেই মানবিক ছিলেন। শুধু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই সময় আমরা গোবিন্দগঞ্জবাসী তার সেই মানবিকতার মূল্য বুঝতে পারিনি।
মূল ঘটনায় আসি।
হাসপাতালের আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের কথা নিশ্চয়ই আপনারা জানেন। এসব প্রতিষ্ঠানের দালালদের হাসপাতালের আশপাশে ঘোরাঘুরি করতেও কিন্তু দেখেন, এমনকি কখনো কখনো এরা সুযোগ পেলে হাসপাতালের ভেতরেও ঢুকে পড়ে এবং রোগীদের নিজেদের প্রতিষ্ঠানে ভাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
সেই সময় সুমন ভাই নিয়মিত হাসপাতালে রোগী দেখতেন। কোনো রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হলে, তিনি রোগীকে আগে দেখে সরাসরি পরামর্শ দিতেন এবং তারপর চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
কিন্তু ঘটনা বাঁক নেয় অন্য জায়গায়।
একজন রোগী সরকারি হাসপাতালে ঢোকার আগেই,দালাল তাকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিজেরাই ডাক্তার সেজে সম্পন্ন করার পর, রোগীকে বলেছিল এখন রিপোর্টগুলো নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখান।
যেহেতু সুমন ভাই স্থানীয় মানুষ ছিলেন এবং বিষয়টি তার নজরে আসে, তিনি রোগীকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন,
আপনি আগে ডাক্তারকে না দেখিয়ে কেন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গেলেন এবং কার পরামর্শে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালেন?
প্রশ্নটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু সেই প্রশ্নই যেন কারও কারও কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল।
এরপরই ঘটে জঘন্য ঘটনা ।
ডায়াগনস্টিক কর্তৃপক্ষ তার এই প্রতিবাদ মেনে নিতে পারেননি বরং রোগীর মাধ্যমে উল্টো সুমন ভাইয়ের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করা হয়।
পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। স্থানীয় কিছু লাফাঙ্গা ছেলেপেলেকে ব্যবহার করে সুমন ভাইকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল।
সরকারি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তাররা বরাবরই নানা দিক থেকে অসহায়। সেই সময়ও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সুমন ভাইকে গোবিন্দগঞ্জ হাসপাতাল থেকে অন্যত্র বদলি করে দেওয়া হয়েছিল।
একটু ভেবে দেখুন, একজন ডাক্তার রোগীর স্বার্থে প্রশ্ন তুললেন। আর সেই প্রশ্নের মূল্য হিসেবে তাকে শারীরিক লাঞ্ছনা, মানসিক হয়রানি, অপবাদ এবং শেষ পর্যন্ত কর্মস্থল থেকে বদলি হতে হলো!
বিষয়টি শুধু একজন ডাক্তারকে ঘিরে নয়। এটি আসলে একটি বৃহত্তর সিন্ডিকেটের চিত্র,যেখানে সাধারণ জনগণ এবং সেইসব চিকিৎসকরাই বারবার বলির পাঁঠা হন, যারা কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করেন।
আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, সুমন ভাইয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার প্রতিবাদে সেই সময় হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও মানববন্ধন করেছিলেন।
তারপরও কি কোনো কার্যকর পরিবর্তন এসেছিল? এক কথায় না।
কারণ ক্ষমতা আর অর্থের কাছে অনেক সময় সত্য, ন্যায় এবং বিবেক, সবকিছুই যেন অসহায় হয়ে পড়ে।
তবে একটা কথা মনে রাখা দরকার, কাউকে একটি হাসপাতাল থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু তার মেধা, যোগ্যতা কিংবা মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছাকে কখনোই সরিয়ে দেওয়া যায় না।
এমন ঘটনার পরেও, সুমন ভাইয়ের জীবনও থেমে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে আরও উচ্চতর যোগ্যতা,MS in Orthopaedic Surgery। বর্তমানে তিনি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (জাতীয় পঙ্গু হাসপাতাল) কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অথচ তার পেশাজীবনের শুরুতে আমরা গোবিন্দগঞ্জবাসী তাকে কী দিয়েছিলাম?
শারীরিক লাঞ্ছনা, মানসিক নির্যাতন, অপবাদ আর কর্মস্থল থেকে বিতাড়ন।
আর আজ, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আবারও ডাক্তার সংকট নিয়ে কথা বলছি, তখন একটু পেছনে তাকান।
২০১৬-১৭ সালের দিকে যখন চিকিৎসক সংকট আরও প্রকট ছিল, তখন একজন স্থানীয় চিকিৎসককে আমরা কীভাবে ধরে রাখতে পেরেছিলাম?
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য, শুরুতেই আমরা যোগ্য ডাক্তারকে যদি হারিয়ে ফেলি, তাহলে সেই ক্ষতির দায় কার?
ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের ব্যবসা তো রমরমাই চলছে , কিন্তু সরকারি হাসপাতালে কেন পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নেই, এ বিষয়ে কি আমরা কখনো প্রশ্ন করেছি ?
হাসপাতালের আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো ক্রমাগত ডায়াগনস্টিক সেন্টার গজিয়ে উঠছে, অথচ সরকারি ১০১ শয্যার আধুনিক হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা নেই, এটা কেমন সেলুকাস বিষয় না!
ভাই রে ভাই,
সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক সংকট কেন?প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা কেন নেই? রোগী কেন হাসপাতালের পরিবর্তে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ছুটতে বাধ্য হয়? হাসপাতালের আশপাশে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে কেন? আর অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো চিকিৎসক দাঁড়ালে তাকেই কেন শেষ পর্যন্ত চরম মূল্য দিতে হয়? এসব নিয়ে কখনো ভেবেছি কি?
পারলে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। পারলে ডায়াগনস্টিক সেন্টার-ক্লিনিক বাণিজ্যের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন।
