কবিরাজের ভেলকি।
ঠিক শেষ বিকেলের দিকে, দূর থেকে মাইকে অদ্ভুত সব কথার আওয়াজ আসছিল। কৌতূহলবশত ইচ্ছে করেই একটু এগিয়ে গেলাম। আসলে হচ্ছেটা কী, সেটা নিজের চোখে দেখার আগ্রহ হলো।
মনে হচ্ছিল না, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আছি।
বিজ্ঞানের জয়জয়কার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ, মানুষ যেখানে মঙ্গলগ্রহে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে,সেখানে বেশ সজোরেই হাঁক-ডাক চলছে কবিরাজের!
ধীরে ধীরে জায়গাটা জমজমাট হয়ে উঠছিল। লালসালু কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে তার বাহারি সব পণ্য। বিভিন্ন বয়ামে জোঁক ঢুকিয়ে রাখা,সেগুলোও বেশ মোটাসোটা। কোথাও বিভিন্ন গাছগাছালির ডালপালা দিয়ে পরিপাক করা তেল, কোথাও আবার বিভিন্ন হাড়হাড্ডি কিংবা সামুদ্রিক মাছের শুকনো অবয়ব।
তবে এসবের চেয়েও মানুষের আগ্রহ বেশি কবিরাজের কথায়। কথার এমন ভেলকি, যেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব ব্যর্থতার সমাধান তার ওই ছোট্ট পসরা আর কয়েক বোতল তেলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
কবিরাজও একের পর এক বাক্য ছুড়ে যাচ্ছিল, জীবনে তো বহুত কিছুই পরীক্ষা করলেন ভাই! একবার শুধু আমার হাতে বানানো একটু তেল আর খানিকটা ওষুধ নিয়ে যান। যেখানেই লাগাবেন, সেখানকার ব্যথাই গায়েব! যত দুর্বলতা আছে, সব দুর্বলতা টেনে বের করবে এই তেল। আপনার নিস্তেজ মানদণ্ডকে চাঙ্গা করার জন্য এই তেলই যথেষ্ট!
খাট ভাঙবে, তবু আপনার মন ভাঙবে না।
সময় যত গড়াচ্ছিল, উপস্থিতিও তত বাড়ছিল। অনেকে আবার বেশ আগ্রহের সঙ্গে কবিরাজের হাতে বানানো তেল-ওষুধ কিনেও ফেলল। খানিক বাদে কবিরাজ নিজেই ঘোষণা দিল,
যদি মনে করেন পকেটে টাকা নেই, তাতেও সমস্যা নেই। আসুন, কাছে আসুন,মাগনায় একটু মাখিয়ে নেন তেল!
ব্যস! মানুষের আগ্রহ যেন আরও বেড়ে গেল।
দীর্ঘ সময় ধরে এসব কর্মকাণ্ড স্বচক্ষে দেখলাম। দেখলাম, কীভাবে কয়েকটি বয়াম, কিছু জোঁক, কিছু শুকনো হাড়হাড্ডি, কয়েক বোতল তেল আর তার সঙ্গে কথার কারসাজি মিলিয়ে একটা জমজমাট চিকিৎসাব্যবস্থা দাঁড় করিয়ে ফেলা যায়!
সবশেষে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম, সেটাই হয়তো সবচেয়ে ভয়ংকর,
২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যদি মানুষ বিজ্ঞানের চেয়ে কথার ভেলকিতে বেশি আস্থা রাখে, চিকিৎসার চেয়ে কবিরাজের হাঁকডাকে যদি বেশি আশ্বস্ত হয়, তাহলে সমস্যাটা শুধু ওই কবিরাজের নয়,সমস্যাটা আমাদের অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস এবং জ্ঞানের প্রতি অনীহার।
বিজ্ঞান যতই এগিয়ে যাক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই মানুষের জীবন বদলে দিক,মানুষ যদি নিজের অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের হতে না চায়, তাহলে লালসালু ঘেরা সেই ছোট্ট আসরগুলো কোনোদিনই শেষ হবে না।
