শেষ ১০০ টাকা
সন্ধ্যা নামছিল শহরের গায়ে। রাস্তার বাতিগুলো একটা একটা করে জ্বলে উঠছে। রফিক হাঁটছিল ধীর পায়ে, পকেটে হাত ঢুকিয়ে। পকেটে একটাই নোট, মোড়ানো, নরম হয়ে যাওয়া একশো টাকার নোট।
দুই মাস হলো কাজ নেই। গ্রামের বাড়ি থেকে আসা এই ছেলেটা ভেবেছিল শহরে এলেই ভাগ্য বদলে যাবে। বদলায়নি। যে দোকানে কাজ করত, সেটা বন্ধ হয়ে গেল। মেসের ভাড়া বাকি, ঘরের মালিক সকালেই চোখ রাঙিয়ে গেছেন। গতকাল রাত থেকে পেটে কিছু পড়েনি। শুধু পানি আর একটা শুকনো বিস্কুট।
আজ সে ঠিক করেছে, এই একশো টাকা দিয়ে পেট ভরে ভাত খাবে। কাল কী হবে, তা কালকের ভাবনা।
মোড়ের ভাতের হোটেলটার দিকে এগোতেই গন্ধটা নাকে এল। গরম ভাত, ডাল, ভাজা মাছ। পেটটা মোচড় দিয়ে উঠল। আর মাত্র দশ কদম।
ঠিক তখনই সে দেখল তাকে।
ফুটপাতের এক কোণে, বন্ধ দোকানের শাটারে হেলান দিয়ে বসে আছেন এক বৃদ্ধা। পরনে ময়লা সাদা শাড়ি, কোলের ওপর একটা ছোট পুঁটলি। চোখ দুটো ঘোলা, কিন্তু সেই চোখে একটা অদ্ভুত অপেক্ষা। তিনি প্রত্যেক পথচারীর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন, আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছিলেন। হাত পাতছিলেন না। শুধু তাকিয়ে ছিলেন।
রফিক পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। নিজেরই পেটে আগুন জ্বলছে, অন্যের কথা ভাবার সুযোগ কোথায়! কিন্তু পা দুটো কেমন যেন থেমে গেল।
"মা, আপনি ঠিক আছেন?"
বৃদ্ধা মুখ তুললেন। ঠোঁট কাঁপল। "বাবা, আমি রহিমা। নেত্রকোনা থেকে এসেছি। ছেলের ঠিকানা নিয়ে এসেছি, কিন্তু..." কথা শেষ হলো না। তিনি পুঁটলি থেকে একটা তেলচিটে কাগজ বের করে দেখালেন। তাতে কাঁপা হাতে লেখা একটা ঠিকানা।
রফিক ঠিকানাটা পড়ল। জায়গাটা এখান থেকে অনেক দূর, বাসে অন্তত চল্লিশ মিনিট।
"আমার ছেলে তিন বছর ধরে ফোন করে না, বাবা। শেষবার বলেছিল ঢাকায় কাজ পেয়েছে। মনটা মানে না। আজ সকালে বাসে উঠেছিলাম, কিন্তু কে যেন আমার টাকার থলেটা..." তাঁর গলা ভেঙে গেল। "ভাড়ার টাকাটাও নেই, বাবা। সারাদিন কিছু খাইনি।"
রফিকের বুকের ভেতরটা চুপ হয়ে গেল।
সে একবার ভাতের হোটেলটার দিকে তাকাল। একবার পকেটের নোটটার কথা ভাবল। একশো টাকা। তার একবেলার ভাত, নয়তো এই মায়ের সন্তানের কাছে পৌঁছানোর পথ।
মনের ভেতর দুটো কণ্ঠ লড়াই করছিল। একটা বলছিল, "তুই নিজেই তো না খেয়ে আছিস, তোকে কে দেখবে?" আরেকটা বলছিল, "তোর মায়ের কথা মনে কর।"
রফিকের মা গ্রামে একা থাকেন। প্রতি মাসে ছেলের ফোনের অপেক্ষায় থাকেন। রফিক যেদিন ফোন করতে পারে না, সেদিন মায়ের কণ্ঠটা কেমন শোনায়, সে জানে।
সে আর ভাবল না। পকেট থেকে নোটটা বের করে বৃদ্ধার হাতে গুঁজে দিল।
"এটা রাখুন, মা। বাসে উঠে সোজা এই ঠিকানায় চলে যান। আর পথে কিছু কিনে খেয়ে নেবেন।"
বৃদ্ধা হতবাক। নোটটার দিকে একবার, রফিকের মুখের দিকে একবার তাকালেন। তাঁর চোখ বেয়ে জল নেমে এল। তিনি রফিকের মাথায় হাত রেখে শুধু বললেন, "আল্লাহ তোমার ভালো করবেন, বাবা। এই দিনটা তোমার জীবনে ফিরে আসবে।"
রফিক হাসল। তারপর ভাতের হোটেলটার পাশ দিয়ে হেঁটে চলে গেল। পেটের ক্ষুধাটা তখন আরও তীব্র, কিন্তু বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা হালকা ভাব।
সে রাতে মেসের বারান্দায় বসে রফিক শুধু পানি খেয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম এল না। কিন্তু আফসোসও হলো না।
সকালে ঘুম ভাঙল দরজায় জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দে।
"নিশ্চয়ই বাড়িওয়ালা," ভাবল রফিক। ভয়ে ভয়ে দরজা খুলল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন এক ভদ্রলোক। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, পরিপাটি পোশাক, চোখে চশমা। তাঁর পেছনে সেই বৃদ্ধা, রহিমা খালা, পরিষ্কার একটা শাড়ি পরে, মুখে এক টুকরো হাসি।
"তুমিই রফিক?" ভদ্রলোকের গলাটা কাঁপছিল। "আমি আনোয়ার। এই মা আমার মা।"
রফিক কিছু বুঝতে পারছিল না।
আনোয়ার বললেন, "আমি তিন বছর আগে ব্যবসায় বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। লজ্জায়, অপমানে মাকে ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সফল হয়ে ফিরে মায়ের সামনে দাঁড়াব। সেই সফলতা আসতে আসতে তিন বছর লেগে গেল। আর এই তিন বছরে মা একা একা..." তিনি থামলেন, চোখ মুছলেন। "গতকাল সন্ধ্যায় মা আমার দরজায় এসে দাঁড়ালেন। বললেন, একটা অচেনা ছেলে নিজের শেষ টাকা দিয়ে তাঁকে পাঠিয়েছে। মা তোমার নাম জিজ্ঞেস করতে ভুলে গিয়েছিলেন। শুধু তোমার মেসের গলিটা মনে ছিল, কারণ তুমি ঠিকানা পড়ে বলেছিলে, 'এই গলির পাশেই আমি থাকি।' সারারাত খুঁজেছি তোমাকে।"
রফিকের গলায় কথা আটকে গেল।
আনোয়ার সাহেব পকেট থেকে একটা কার্ড বের করলেন। তাতে লেখা, আনোয়ার প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং, ম্যানেজিং ডিরেক্টর।
"আমার কারখানায় লোক দরকার। এমন একজন, যে অভাবের মধ্যেও মানুষকে চিনতে পারে, যার ওপর ভরসা করা যায়। ডিগ্রি দিয়ে সবকিছু মাপা যায় না, রফিক। তুমি আমার মায়ের জন্য যা করেছ, তার দাম আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না। কিন্তু তুমি যদি আমার সঙ্গে কাজ করো, আমি নিজেকে একটু হলেও ঋণমুক্ত ভাবতে পারব।"
রহিমা খালা এগিয়ে এসে একটা টিফিন ক্যারিয়ার রফিকের হাতে দিলেন। ঢাকনা খুলতেই গরম ভাত আর মুরগির ঝোলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। "কাল তোমার খাওয়া হয়নি, বাবা। আমি জানি। যে নিজের ভাতের টাকা অন্যকে দেয়, সে সারা রাত পেটে হাত দিয়ে শুয়ে থাকে।"
রফিকের চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সে কিছু বলতে পারল না। শুধু মাথা নিচু করে বসে পড়ল, আর খেতে খেতে নিঃশব্দে কাঁদল।
আজ বছর পাঁচেক পরের কথা। রফিক এখন আনোয়ার প্রিন্টিং-এর প্রোডাকশন ম্যানেজার। গ্রামের মাকে সে শহরে এনে নিজের কাছে রেখেছে। প্রতি শুক্রবার সে আর আনোয়ার সাহেব দুই মাকে নিয়ে একসঙ্গে খেতে বসেন।
আর রফিকের পকেটে সবসময় একটা একশো টাকার নোট থাকে। খরচ করার জন্য নয়, কাউকে দেওয়ার জন্য। যেদিন যে মানুষটার সবচেয়ে বেশি দরকার, সেদিন সেই নোট তার হাতে চলে যায়।
কারণ রফিক জেনে গেছে, আমরা যা দিয়ে দিই, সেটা হারিয়ে যায় না। সেটা অন্য কোনো পথ ঘুরে, অন্য কোনো রূপে, ঠিক সময়ে আমাদের কাছেই ফিরে আসে।
শিক্ষা: মানুষের সত্যিকারের সম্পদ তার পকেটের টাকা নয়, তার হৃদয়ের প্রশস্ততা। যে অভাবের মধ্যেও দিতে জানে, ঈশ্বর তাকে কখনো খালি হাতে ফেরান না।
