যে দোকানদার মিথ্যা বলতে পারেননি
একজন দোকানদার কীভাবে সততার কারণে ব্যবসা হারানোর ঝুঁকি নিয়েও পরে বড় সাফল্য পেলেন?
সিলেটের এক বাজারে ছোট্ট একটা মুদি দোকান চালাতেন আব্দুল হাই। বাবার কাছ থেকে পাওয়া দোকানটা দিয়েই সংসার চলত—স্ত্রী, দুই সন্তান, আর বৃদ্ধ মা।
একদিন দুপুরে এক ক্রেতা এলেন, চাল কিনতে চাইলেন। আব্দুল হাই তাকে বললেন, "ভাই, গতকাল যে চালটা এসেছে সেটাতে কিছুটা পোকা ধরেছে। আজকেরটা ভালো, কিন্তু দাম একটু বেশি।"
ক্রেতা অবাক হয়ে বললেন, "আপনি নিজে থেকেই বলে দিলেন? অন্য দোকানে তো এসব লুকিয়ে রাখে।"
আব্দুল হাই মুচকি হেসে বললেন, "ভাই, আমার আব্বা মারা যাওয়ার আগে একটা কথা বলে গিয়েছিলেন—'ব্যবসায় মিথ্যা বলে যে টাকা আসে, তাতে বরকত থাকে না। সেই টাকা দিয়ে কেনা ভাতও পেটে হজম হয় না ঠিকমতো।' আমি সেই কথা ভুলিনি।"
কথাটা শুনে ক্রেতা খুশি হয়ে ভালো চালটাই কিনলেন, আর বাজারে গিয়ে সবাইকে বলে বেড়ালেন এই সৎ দোকানদারের কথা। ধীরে ধীরে আব্দুল হাইয়ের দোকানে ভিড় বাড়তে লাগল।
কিন্তু ব্যবসা সবসময় সহজ যায়নি। এক রমজানে পাইকারি বাজারে জিনিসপত্রের দাম হঠাৎ বেড়ে গেল। আশেপাশের সব দোকানদার দাম বাড়িয়ে দিলেন, কেউ কেউ তো দ্বিগুণ দামেও বিক্রি করতে লাগলেন, কারণ রোজার মাসে মানুষ কিনবেই।
আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী বললেন, "সবাই তো বাড়াচ্ছে, আমরাও একটু বাড়াই। রমজানে বাড়তি খরচ তো আছেই।"
আব্দুল হাই মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, "যদি আমরা বাড়তি লাভ করার জন্য মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিই, তাহলে সেটা তো জুলুম হয়ে যাবে। আমি শুধু যা খরচ বেড়েছে ততটুকুই বাড়াব, এর বেশি না।"
সেই রমজানে আব্দুল হাইয়ের লাভ কমে গেল অন্যদের তুলনায় অনেকটাই। প্রতিবেশী দোকানদাররা হাসাহাসি করত, "ভাই এভাবে ব্যবসা হয় নাকি! আপনি তো লস করছেন।"
আব্দুল হাই শুধু বলতেন, "আল্লাহই তো রিজিকদাতা। আমার কাজ শুধু হালাল পথে চেষ্টা করা।"
ঈদের পরের দিন এক লোক দোকানে এসে বললেন, "ভাই, আমি ঢাকা থেকে এসেছি। আমার বোন এই এলাকায় থাকে, সে আপনার দোকানের কথা বলেছিল—কীভাবে রমজানে আপনি দাম বাড়াননি। আমি একটা বড় হোটেল চালাই, প্রতি মাসে অনেক চাল-ডাল লাগে। আপনার সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করতে চাই, সরাসরি আপনার থেকেই মাল নেব।"
আব্দুল হাই প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না। সেই একটা চুক্তি তার ছোট্ট দোকানের আয় বদলে দিল। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি দোকান বড় করলেন, আরও দুজন কর্মচারী রাখলেন।
একদিন তার ছেলে জিজ্ঞেস করল, "আব্বা, আপনি কি জানতেন এমন কিছু হবে?"
আব্দুল হাই হাসলেন, "না বাবা, আমি জানতাম না কী হবে। আমি শুধু জানতাম, সৎ পথে থাকলে আল্লাহ কোনো না কোনোভাবে ব্যবস্থা করে দেবেন। রিজিকের হিসাব আমাদের হাতে নেই, কিন্তু হালাল-হারামের হিসাব আমাদের হাতেই।"
যিনি আল্লাহকে ভয় করে চলেন, আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন, এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।
সাময়িক লাভের জন্য মানুষকে ঠকানো, মিথ্যা বলা বা জুলুম করা—এতে হয়তো তাৎক্ষণিক লাভ দেখা যায়, কিন্তু বরকত থাকে না। আর সততার পথ কখনো কখনো কঠিন মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত সেটাই টিকে থাকে।
"আপনার জীবনে কি এমন কোনো মুহূর্ত এসেছে যখন সততা বেছে নেওয়া কঠিন ছিল?"