শূন্য শহরে আমি
ছুটে চলেছি অজানা অচেনা গন্তব্যের দিকে। আমি জানি না আমি কোথায় যাচ্ছি। তবে আমি জানি এটুকু যে আমাকে যেতেই হবে। কোনো পথ বাকি নেই, যাওয়া ছাড়া।
গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ। ছুটে চলেছি দিগন্ত-প্লাবিত শূন্যে। এটি মহাকাশের মহাশূন্য নয়। এটি একটি সুন্দর জনপদের গল্প, যেখানে শূন্যতা সর্বত্র বিরাজমান।
সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে। আকাশের কোণে লালচে আভা তখনও পুরোপুরি মেলায়নি, কিন্তু মাটির বুকে অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। পায়ের নিচে কাঁচা রাস্তার ধুলো আর দুই পাশে কেবল ধানখেতের নিস্তব্ধ সারি। বাতাসে ধানের গন্ধ ছিল, অথচ কোথাও কোনো পাখির ডাক নেই, কুকুরের ঘেউ নেই, গরুর গলার ঘণ্টার শব্দ নেই। এমন নীরবতা আমি আগে কখনো শুনিনি। হ্যাঁ, নীরবতাকেও শোনা যায়। সে কানের ভেতরে একটানা ভোঁ ভোঁ করে বাজে, ঠিক যেন কেউ বহুদূর থেকে আমার নাম ধরে ডাকছে, অথচ নামটা আমি আর মনে করতে পারছি না।
হাঁটতে হাঁটতে একসময় একটা বাঁশের সাঁকোর সামনে এসে দাঁড়ালাম। নিচে নদী, কিন্তু জলে কোনো স্রোত নেই। জল যেন থমকে আছে, যেন সময়ও সেখানে আটকে গেছে। সাঁকোর ওপারে দূরে টিমটিম করে কয়েকটা ঘরের আলো দেখা গেল। বুকের ভেতর কেমন একটা আশা জেগে উঠল। মানুষ আছে তাহলে! আমি প্রায় দৌড়েই সাঁকো পার হলাম।
জনপদের মুখে একটা কাঠের ফলক ঝুলছিল, অক্ষরগুলো প্রায় মুছে গেছে। অনেক কষ্টে পড়লাম: নিঃশব্দপুর। নামটা শুনে গা শিরশির করে উঠল, কিন্তু ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় আমার ছিল না। আমি তো আগেই বলেছি, আমার কোনো পথ বাকি নেই।
ভেতরে ঢুকে দেখি সুন্দর সাজানো গ্রাম। টিনের চালের ঘর, উঠোনে তুলসীতলা, দাওয়ায় মাটির প্রদীপ। হাট-বাজারের চালাঘরে পসরা সাজানো, মাছ-সবজি-মশলা সবই আছে। চায়ের দোকানে কেটলিতে ধোঁয়া উঠছে। অথচ কোথাও একটাও কথা নেই। মানুষ আছে, অনেক মানুষ। কেউ উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে, কেউ জাল বুনছে, কেউ বসে আছে বটতলায়। কিন্তু তাদের চোখগুলো কাচের মতো স্বচ্ছ আর ফাঁকা। তারা আমাকে দেখল, অথচ দেখল না। আমি "ভাই, শুনছেন?" বলে ডাকলাম। কেউ ফিরে তাকাল না। একজন বৃদ্ধের কাঁধে হাত রাখলাম। তিনি এমনভাবে হাঁটতে থাকলেন, যেন আমি বাতাসের চেয়েও হালকা কিছু।
চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়লাম। দোকানি আমার সামনে এক কাপ চা নামিয়ে রাখল। কোনো দাম চাইল না, কোনো কথাও বলল না। চায়ের কাপটা গরম ছিল, কিন্তু স্বাদ ছিল না। মিষ্টিও নয়, তেতোও নয়। মুখে দিলে কেবল একটা শূন্যতার অনুভূতি হয়, যেন জিভটাও এই গ্রামের মতোই ফাঁকা হয়ে গেছে।
রাত গভীর হলো। আমি গ্রামের পথে পথে হাঁটলাম। প্রতিটা ঘরের জানালায় আলো, কিন্তু কোনো ঘরে হাসির শব্দ নেই, কান্নার শব্দ নেই, বাসনপত্রের টুংটাং নেই। একটা ঘরের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম, এক মা তাঁর ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। শিশুটি হাত বাড়িয়ে মায়ের মুখ ছুঁতে চাইছে, আর মা তাকিয়ে আছেন দেয়ালের দিকে। শিশুটির ঠোঁট নড়ছে, সে কিছু বলতে চায়, কিন্তু কোনো আওয়াজ বেরোচ্ছে না। আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। এ কেমন শূন্যতা, যা মায়ের কোল থেকেও সন্তানের ডাক কেড়ে নেয়?
গ্রামের একেবারে মাঝখানে একটা পুরোনো বটগাছ, তার নিচে একটা পরিত্যক্ত কুয়া। কুয়ার পাড়ে বসে ছিল একজন মানুষ। এই প্রথম কাউকে দেখলাম, যার চোখ ফাঁকা নয়। জীর্ণ চাদর গায়ে, মুখভর্তি পাকা দাড়ি, আর চোখে এমন এক ক্লান্তি যা কেবল দীর্ঘ অপেক্ষার পরেই আসে।
"তুমি কথা বলতে পারো?" আমি প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি মৃদু হাসলেন। "পারি। কারণ আমি এখনো কিছু একটা হারাতে দিইনি।"
"এই গ্রামের কী হয়েছে?"
"এই গ্রামের কিছুই হয়নি, বাবা। হয়েছে মানুষের।" তিনি কুয়ার অন্ধকার গহ্বরের দিকে ইশারা করলেন। "একদিন এখানকার মানুষ নিজেদের সব কথা, সব স্বপ্ন, সব কষ্ট এই কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল। ভেবেছিল, কষ্ট না থাকলে শান্তি আসবে। কিন্তু তারা বোঝেনি, কষ্ট ফেলতে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসাও ফেলে দিয়েছে। কারণ যে হৃদয় কাঁদতে পারে না, সে হাসতেও পারে না।"
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বৃদ্ধ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কিন্তু এমনি এমনি এখানে আসোনি। যারা নিজের ভেতরে শূন্যতা বয়ে বেড়ায়, নিঃশব্দপুর তাদেরই ডেকে আনে।"
কথাটা বুকে গিয়ে বিঁধল। সত্যিই তো! আমি কেন ছুটছিলাম? কীসের থেকে পালাচ্ছিলাম? মনে পড়ল, কয়েক বছর আগে আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা চলে গেছেন। আমি কাঁদিনি। আমি নিজেকে বলেছিলাম, শক্ত হও, এগিয়ে চলো। তারপর থেকে আমি কেবল ছুটেছি। শহর থেকে শহরে, কাজ থেকে কাজে, দিন থেকে রাতে। থামলেই যদি সেই ব্যথাটা ফিরে আসে! আমিও যে আমার সমস্ত কান্না নিজের ভেতরের কোনো এক গহিন কুয়ায় ফেলে দিয়েছিলাম, সে কথা আজ এই অচেনা গ্রামে এসে প্রথম বুঝলাম।
"তাহলে এখন কী করব?" আমার গলা কেঁপে গেল।
"যা ফেলে দিয়েছ, তা ফিরিয়ে আনো।" বৃদ্ধ কুয়ার দড়িটা আমার হাতে তুলে দিলেন। "কিন্তু সাবধান। যা উঠে আসবে, তা মিষ্টি হবে না। প্রথমে আসবে ব্যথা। ব্যথার পরেই কেবল ফিরবে বাকিটা।"
কাঁপা হাতে দড়ি ধরলাম। বালতিটা ধীরে ধীরে নামতে নামতে অতল অন্ধকারে হারিয়ে গেল। অনেকক্ষণ কোনো শব্দ নেই। তারপর টান পড়ল। ভারী, বড়ো ভারী। আমি সমস্ত শক্তি দিয়ে টানতে লাগলাম। বালতিটা যখন উঠে এল, তার ভেতরে কিছু নেই, শুধু একটু জল। স্বচ্ছ, শীতল জল। আমি তাতে নিজের মুখের ছায়া দেখলাম, আর ঠিক তখনই এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল। আমার চোখ বেয়ে গরম কিছু গড়িয়ে পড়ল। একটা ফোঁটা, তারপর আরও একটা। আমি কাঁদছিলাম। কত বছর পর, জানি না। আমি হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লাম আর শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলাম। আমার কান্নার শব্দ পুরো নিঃশব্দ গ্রামে প্রতিধ্বনি তুলল।
আর তখনই, গ্রামের কোথাও একটা শিশু কেঁদে উঠল।
প্রথমে একটা, তারপর দুটো, তারপর অসংখ্য কণ্ঠ। কোথাও দরজা খুলে গেল, কোথাও কেউ নাম ধরে ডেকে উঠল, কোথাও ভাঙা গলায় কেউ হেসে উঠল। যে মা শিশুটিকে কোলে নিয়ে বসে ছিলেন, তিনি হঠাৎ সন্তানের মুখে চুমু খেয়ে ফুঁপিয়ে উঠলেন। চায়ের দোকানে কেটলির শব্দ ছাপিয়ে কেউ গান ধরল। এক এক করে সব ঘরের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শূন্যতার বাঁধ ভেঙে গেল, আর তার জায়গায় ভেসে এল জীবনের কোলাহল।
আমি মুখ তুলে বৃদ্ধের দিকে তাকালাম। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। শুধু বটগাছের ডালে বসে একটা পাখি ডেকে উঠল, বহুদিন পর প্রথম ভোরের ডাক।
পূর্ব দিগন্তে তখন সূর্য উঠছে। আমি জানি না আমি কোথায় যাচ্ছি। কিন্তু এখন আর আমার ভয় করছে না। কারণ আমি বুঝেছি, শূন্যতা কোনো জায়গার নাম নয়। শূন্যতা একটা অবস্থা, যা আমরা নিজেরাই নিজেদের ভেতরে তৈরি করি। আর যে তাকে স্বীকার করতে পারে, সে-ই তাকে পূর্ণ করার পথও খুঁজে পায়।
আমি এবার ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম। ছুটে নয়, হেঁটে। এই প্রথম গন্তব্য নয়, পথটাই আমার কাছে সুন্দর মনে হলো।
সমাপ্ত
