ছোটভিডিওর নেশায় কি আমরা দীর্ঘসময় মনোযোগ দিয়ে থাকার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি?

in আমার বাংলা ব্লগ • 16 hours ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।




Lost in the Digital Scroll (1).png

একবার নিজের দৈনন্দিন জীবনের দিকে একটু খেয়াল করে দেখুন তো, আপনি যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে বসেন, তখন কতক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন? বই পড়তে বসলে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পরই কি ফোনের কথা মনে পড়ে? কোনো শিক্ষামূলক ভিডিও দেখতে গিয়ে মাঝপথে অন্য কিছু দেখার ইচ্ছা হয়? কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলার সময়ও কি অজান্তেই হাত চলে যায় মুঠোফোনের দিকে? এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেকের জীবনেই পরিচিত। অথচ কয়েক বছর আগেও হয়তো আমরা একটি সিনেমা, একটি উপন্যাস কিংবা দীর্ঘ কোনো আলোচনা বেশ আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করতে পারতাম। এখন কয়েক মিনিটের কোনো বিষয়েও মনোযোগ ধরে রাখা অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়। এর পেছনে ছোট ছোট ভিডিও দেখার অভ্যাসের কোনো ভূমিকা আছে কি? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিনোদনের জন্য যে অভ্যাস আমরা তৈরি করছি, সেটি ধীরে ধীরে আমাদের কাজ করার ধরনেও প্রভাব ফেলতে পারে।বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই একের পর এক ছোট ভিডিও সামনে চলে আসে। কোনো ভিডিওতে হাসির দৃশ্য, কোনো ভিডিওতে রান্নার কৌশল, আবার কোনো ভিডিওতে ভ্রমণ, খেলাধুলা কিংবা অবাক করা কোনো ঘটনা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নতুন কিছু দেখার সুযোগ পাওয়া যায়। একটি ভিডিও ভালো না লাগলে সেটি শেষ হওয়ার অপেক্ষাও করতে হয় না, আঙুলের সামান্য স্পর্শেই চলে আসে আরেকটি ভিডিও। এভাবে কখন যে দশ মিনিট, আধা ঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেক সময় আমরা বুঝতেই পারি না। সমস্যাটা শুধু বেশি সময় নষ্ট হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিনিয়ত দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়বস্তু দেখতে দেখতে আমাদের মনোযোগের অভ্যাসেও পরিবর্তন আসতে পারে। মানুষের মস্তিষ্ক নতুন কিছু জানতে এবং আকর্ষণীয় ঘটনা খুঁজে পেতে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহী। ছোট ভিডিওগুলো এই আগ্রহকে কাজে লাগানোর জন্য তৈরি করা হয়। একটি ভিডিওতে হাসির কিছু, পরেরটিতে চমকপ্রদ ঘটনা, তার পরেরটিতে আবেগঘন দৃশ্য। প্রতিবারই নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে আমরা ভাবতে থাকি, পরের ভিডিওটি হয়তো আরও মজার হবে। এই প্রত্যাশা থেকেই বারবার পরের ভিডিও দেখার ইচ্ছা তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো ভিডিও দেখার জন্য মুঠোফোন হাতে নিই না। শুধু একটু সময় কাটানোর জন্য প্রবেশ করি, তারপর একের পর এক ভিডিও দেখতে দেখতে নিজের অজান্তেই দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিই।এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ছোট ভিডিও দেখলেই মানুষের মনোযোগ নষ্ট হয়ে যায়, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। আবার ছোট ভিডিও দেখার অভ্যাসই মনোযোগ কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ, সেটিও ঠিক নয়। ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একঘেয়েমি, কাজের পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত অভ্যাসও মনোযোগের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে অতিরিক্ত ছোট ভিডিও দেখার অভ্যাস কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে একটি কাজে মনোযোগ দেওয়াকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে যখন বিনোদনের অধিকাংশ সময় দ্রুত পরিবর্তনশীল বিষয়বস্তু দেখেই কাটে, তখন ধীরগতির কাজে আগ্রহ ধরে রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।ধরুন, একজন শিক্ষার্থী পড়তে বসেছে। বইয়ের একটি অধ্যায় বুঝতে তার বিশ মিনিট সময় লাগতে পারে। বিষয়টি বুঝতে হলে তাকে মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে, আগের কথার সঙ্গে পরের কথার সম্পর্ক খুঁজতে হবে এবং প্রয়োজনে কোনো অংশ আবার পড়তে হবে। কিন্তু তার মস্তিষ্ক যদি সব সময় কয়েক সেকেন্ড পরপর নতুন দৃশ্য দেখার অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তাহলে বইয়ের একই পাতায় দীর্ঘ সময় থাকা তার কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তখন সে হয়তো ভাবে, একটু ভিডিও দেখে আবার পড়তে বসবে। কিন্তু সেই একটু সময় কখন যে চল্লিশ মিনিটে পরিণত হয়, তা বুঝতে পারে না। শেষ পর্যন্ত পড়াশোনার সময় কমে যায়, কাজ জমতে থাকে এবং নিজের ওপর বিরক্তি তৈরি হয়।এখানে আসল বিষয়টি হলো, বই পড়া আর ছোট ভিডিও দেখা একই ধরনের মানসিক অভিজ্ঞতা নয়। একটি বই পড়তে হলে আমাদের নিজে থেকে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। অনেক সময় বিষয়টি বুঝতে চিন্তা করতে হয়, কল্পনা করতে হয় এবং তথ্য মনে রাখতে হয়। অন্যদিকে ছোট ভিডিওতে দৃশ্য, শব্দ, লেখা ও ঘটনা দ্রুত পরিবর্তিত হয়। দর্শককে নতুন বিষয়ের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। তাই বই পড়া বা দীর্ঘ কোনো কাজের তুলনায় ছোট ভিডিও দেখা অনেকের কাছে সহজ ও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে ছোট ভিডিও মস্তিষ্ককে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেয়। বরং আমরা যে ধরনের কাজে নিয়মিত সময় দিই, সেই ধরনের কাজের প্রতি আমাদের অভ্যাস ও স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি হতে পারে।

আরেকটি বিষয় লক্ষ করার মতো। অনেক সময় আমরা কোনো কাজ শুরু করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিরক্ত হয়ে যাই। মনে হয়, কাজটি অনেক দীর্ঘ, অন্য কিছু করলে হয়তো বেশি ভালো লাগবে। তখন আমরা ফোন খুলে কয়েকটি ভিডিও দেখি। সাময়িকভাবে ভালো লাগলেও কাজটিতে ফিরে আসার পর আবার মনোযোগ তৈরি করতে সময় লাগে। এভাবে বারবার কাজের মাঝখানে বিরতি নিলে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে পড়াশোনা, লেখালেখি কিংবা এমন কোনো কাজে, যেখানে গভীরভাবে চিন্তা করতে হয়, সেখানে ঘন ঘন মনোযোগ সরে যাওয়া কাজের গতি কমিয়ে দিতে পারে।শুধু পড়াশোনা নয়, বাস্তব জীবনেও এর প্রভাব দেখা যেতে পারে। কারও সঙ্গে গল্প করতে করতে হঠাৎ ফোনে ভিডিও দেখা শুরু করা, পরিবারের সদস্যদের কথা শোনার সময় অন্যদিকে মন চলে যাওয়া কিংবা কোনো সিনেমা দেখতে গিয়ে বারবার ফোন পরীক্ষা করা—এসব আচরণ আমাদের পারস্পরিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মনোযোগ শুধু কাজ শেষ করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; অন্য মানুষকে বোঝার জন্যও এটি প্রয়োজন। কেউ যখন নিজের জীবনের কোনো ঘটনা আমাদের বলতে চান, তখন তার কথা মন দিয়ে শোনা মানে তাকে গুরুত্ব দেওয়া। অথচ আমরা যদি প্রতিনিয়ত নতুন কোনো দৃশ্য বা খবরের অপেক্ষায় থাকি, তাহলে সামনাসামনি কথোপকথনের মতো স্বাভাবিক বিষয়েও মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।তবে ছোট ভিডিওর ভালো দিকও রয়েছে। অল্প সময়ে নতুন কোনো তথ্য জানা, রান্নার কৌশল শেখা, কোনো বৈজ্ঞানিক বিষয়ের প্রাথমিক ধারণা পাওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এগুলো কার্যকর হতে পারে। অনেক শিক্ষার্থী ছোট ভিডিওর মাধ্যমে কঠিন বিষয়ের সহজ ব্যাখ্যা পায়। কেউ নতুন ভাষা শেখে, কেউ ব্যায়ামের সঠিক পদ্ধতি বোঝে, আবার কেউ পৃথিবীর অজানা কোনো ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে। তাই ছোট ভিডিওকে পুরোপুরি খারাপ বলা যুক্তিসংগত নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন আমরা কী দেখব, কতক্ষণ দেখব এবং কখন থামব—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি।তাহলে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? প্রথমেই নিজের ব্যবহারের ধরন বুঝতে হবে। প্রতিদিন কতক্ষণ ছোট ভিডিও দেখছি, কোন সময়ে বেশি দেখছি এবং দেখার কারণে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া দরকার। যদি দেখা যায়, পড়তে বসার আগে বা ঘুমানোর সময় অকারণে দীর্ঘক্ষণ ভিডিও দেখা হচ্ছে, তাহলে ওই সময়গুলোতে ফোন ব্যবহার সীমিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞপ্তি বন্ধ রাখা যায়। ফোন হাতের কাছে না রেখে অন্য জায়গায় রাখলেও বারবার সেটি দেখার প্রবণতা কমতে পারে।দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে কাজ করার অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে। শুরুতেই একটানা দুই ঘণ্টা পড়ার লক্ষ্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং প্রথমে পনেরো বা বিশ মিনিট একটি নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। তারপর অল্প বিরতি নিয়ে আবার কাজে ফেরা যায়। সময়ের সঙ্গে নিজের সুবিধা অনুযায়ী এই সময় বাড়ানো সম্ভব। বই পড়া, দীর্ঘ কোনো লেখা পড়া, ছবি আঁকা, নতুন কিছু শেখা কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ফোন ছাড়া সময় কাটানোও মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাস তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মনোযোগ সরে গেলেই নিজেকে ব্যর্থ ভাবা যাবে না। মন অন্যদিকে চলে গেলে আবার কাজে ফিরে আসার চেষ্টা করতে হবে।আরেকটি কার্যকর অভ্যাস হতে পারে, ভিডিও দেখার আগে নিজের কাছে একটি প্রশ্ন রাখা—আমি এখন কেন ভিডিও দেখছি? কোনো নির্দিষ্ট বিষয় শেখার জন্য, বিনোদনের জন্য, নাকি শুধু বিরক্তি কাটানোর জন্য? যদি নির্দিষ্ট কিছু শেখার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে সেই বিষয়ের প্রয়োজনীয় ভিডিও দেখে বেরিয়ে আসা যায়। আর যদি শুধু অবসর কাটানোর জন্য ফোন হাতে নেওয়া হয়, তাহলে অন্য কোনো কাজ বেছে নেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। হাঁটতে যাওয়া, গান শোনা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলা কিংবা কিছুক্ষণ চুপচাপ বিশ্রাম নেওয়াও অবসর কাটানোর স্বাভাবিক উপায়।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, আমাদের মনোযোগ কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, আবার একদিনেই নষ্ট হয়ে যায় না। ছোট ভিডিও দেখার অভ্যাস যদি কাজের ক্ষতি করে, তাহলে ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস পরিবর্তন করাও সম্ভব। এর জন্য প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ দূরে চলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রযুক্তিকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা, প্রযুক্তির অভ্যাসের কাছে নিজের সময়কে পুরোপুরি সমর্পণ না করা।একবার ভেবে দেখুন, আমরা প্রতিদিন অসংখ্য ছোট ভিডিও দেখে কত কিছু জানতে পারছি, কত হাসির মুহূর্ত উপভোগ করছি। কিন্তু সেই ব্যস্ততার মধ্যে নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করার মতো পর্যাপ্ত মনোযোগ কি ধরে রাখতে পারছি? যে সময়টুকু আমরা অবসরের আনন্দের জন্য ব্যয় করছি, সেটি যেন আমাদের প্রয়োজনীয় কাজ, সম্পর্ক এবং নিজের বিকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।মনে রাখবেন, সমস্যা ছোট ভিডিওতে নয়; সমস্যা হলো যখন কয়েক সেকেন্ডের বিনোদন আমাদের দীর্ঘ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে বারবার দূরে সরিয়ে দেয়।** প্রযুক্তি আমাদের সময়কে আনন্দময় করতে পারে, জ্ঞান বাড়াতে পারে, নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু নিজের সময় এবং মনোযোগের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার দায়িত্বটা শেষ পর্যন্ত আমাদেরই। কারণ জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্জন কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া যায় না। সেগুলোর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করে যাওয়ার ক্ষমতা।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png