কখনো কি এমন হয়েছে, ফেসবুকে কোনো একটি খবর দেখলে প্রথমে সেটি বিশ্বাস করোনি, কিন্তু কয়েক দিন পর একই খবর আবার দেখলে মনে হয়েছে, কথাটার মধ্যে হয়তো সত্যতা আছে? এরপর ইউটিউবের কোনো ভিডিওতে একই দাবি শুনলে, পরিচিত কারও মুখে কথাটি শুনলে কিংবা অন্য কোনো পৃষ্ঠায় একই তথ্য চোখে পড়লে একসময় সেটিকে সত্য বলেই মনে হতে শুরু করেছে? অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতবার দেখার পরও হয়তো তুমি একবারের জন্যও তথ্যটির সত্যতা যাচাই করোনি। শুধু বারবার চোখে পড়েছে বলেই সেটি তোমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। মানুষের মস্তিষ্কের এই অদ্ভুত প্রবণতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে খুব স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। আর ইন্টারনেটের যুগে এই প্রবণতাকে কাজে লাগিয়ে ভুল তথ্যও খুব সহজে মানুষের বিশ্বাসের অংশ হয়ে যেতে পারে।মনোবিজ্ঞানে এই ঘটনাকে বলা হয় বারবার পরিচিত হওয়ার প্রভাব। ইংরেজিতে এর নাম *ইলিউসরি ট্রুথ ইফেক্ট*। সহজ ভাষায়, কোনো তথ্য বারবার শুনলে বা দেখলে সেটিকে সত্য বলে মনে হওয়ার প্রবণতাই এই প্রভাবের মূল কথা। কোনো বক্তব্য সত্য কি না, তা যাচাই করার পরিবর্তে আমাদের মস্তিষ্ক অনেক সময় সেটি কতটা পরিচিত মনে হচ্ছে, সেই অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেয়। একটি কথা আগে শুনেছি, কোথাও দেখেছি কিংবা পরিচিত কেউ বলেছে—এই পরিচিতির অনুভূতি আমাদের কাছে কথাটিকে গ্রহণ করা সহজ করে তুলতে পারে। কিন্তু কোনো তথ্য পরিচিত হওয়া আর তথ্যটি সত্য হওয়া এক বিষয় নয়।বিষয়টি বোঝার জন্য একটি সাধারণ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে দাবি করা হলো, একটি নির্দিষ্ট খাবার খেলেই সব ধরনের শারীরিক সমস্যা দূর হয়ে যায়। প্রথমবার পোস্টটি দেখে তোমার সন্দেহ হলো। কয়েক দিন পর অন্য একটি পৃষ্ঠায় একই দাবি দেখলে। এরপর একটি ছোট ভিডিওতে একই কথা শুনলে। আবার পরিচিত কেউ কথাটি বিশ্বাস করে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিল। তখন তোমার মনে হতে পারে, এত মানুষ যখন একই কথা বলছে, নিশ্চয়ই এর মধ্যে কিছু সত্যতা আছে। কিন্তু বাস্তবে ওই সব পোস্টের তথ্য হয়তো একই অবিশ্বস্ত উৎস থেকে এসেছে। তথ্যটি বারবার প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তৈরি হয়নি। অর্থাৎ, একই দাবি অনেকবার দেখা গেলেও সেটি সত্য হয়ে যায় না।
প্রশ্ন হলো, আমাদের মস্তিষ্ক এমন ভুল করে কেন?
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, পরিচিত তথ্য বুঝতে আমাদের সাধারণত কম মানসিক পরিশ্রম করতে হয়। নতুন কোনো বক্তব্য শুনলে আমরা সেটি বুঝতে, বিচার করতে এবং আগের জ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চেষ্টা করি। কিন্তু কোনো বক্তব্য আগে শোনা থাকলে সেটি তুলনামূলকভাবে সহজ মনে হতে পারে। মনোবিজ্ঞানে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের এই সহজ অনুভূতিকে বলা হয় *কগনিটিভ ফ্লুয়েন্সি*, অর্থাৎ মানসিক প্রক্রিয়াকরণের সাবলীলতা। কোনো বক্তব্য সহজে বুঝতে পারছি বা পরিচিত লাগছে বলে সেটিকে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। সমস্যা হলো, আমরা সব সময় বুঝতে পারি না যে এই পরিচিতির অনুভূতি আসছে বারবার দেখার কারণে, নাকি সত্যিই তথ্যটির পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ রয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, মানুষ সব সময় প্রতিটি তথ্য গভীরভাবে যাচাই করার মতো সময় বা মানসিক শক্তি ব্যবহার করে না। প্রতিদিন আমরা অসংখ্য খবর, ছবি, ভিডিও, বিজ্ঞাপন ও মতামতের মুখোমুখি হই। প্রতিটি বক্তব্যের উৎস খুঁজে দেখা, গবেষণার ফলাফল যাচাই করা কিংবা বিপরীত প্রমাণ খোঁজা বাস্তবে কঠিন। তাই অনেক সময় মস্তিষ্ক সহজ কিছু সংকেত ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। পরিচিতি, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা, অনেক মানুষের সমর্থন কিংবা একই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি—এসব দেখে আমরা দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতে পারি। দৈনন্দিন জীবনে এই মানসিক শর্টকাট কখনো কাজে লাগলেও ভুল তথ্যের ক্ষেত্রে এটি আমাদের বিভ্রান্ত করতে পারে।ইন্টারনেট এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগে কোনো ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়তে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগত। এখন একটি পোস্ট কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কেউ তথ্যটি যাচাই না করেই শেয়ার করে, অন্য কেউ সেটি দেখে আবার শেয়ার করে, এরপর আরও অনেকে একই কাজ করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই একই দাবি বিভিন্ন পৃষ্ঠা, দল ও আলোচনায় ছড়িয়ে পড়ে। একজন সাধারণ পাঠকের কাছে মনে হতে পারে, এত জায়গায় একই খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাই এটি নিশ্চয়ই সত্য। কিন্তু অনেক সময় এসব আলাদা প্রকাশনা স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করেনি; তারা শুধু একে অপরের কাছ থেকে একই দাবি নিয়েছে।এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সুপারিশব্যবস্থা আমাদের আগ্রহের সঙ্গে মেলে এমন বিষয় বারবার সামনে আনতে পারে। তুমি যদি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ভিডিও দেখো, সেই বিষয়ের আরও ভিডিও তোমার সামনে আসতে পারে। ফলে একই ধরনের বক্তব্য বারবার চোখে পড়ে। কখনো এমনও হয়, তুমি যে মতামত আগে থেকেই বিশ্বাস করো, তার সমর্থনে অনেক পোস্ট দেখতে পাও। তখন মনে হতে পারে, অধিকাংশ মানুষই তোমার মতো চিন্তা করে এবং তোমার বিশ্বাসটিই সঠিক। মনোবিজ্ঞানে নিজের বিদ্যমান বিশ্বাসকে সমর্থন করে এমন তথ্যের প্রতি বেশি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতাকে বলা হয় *কনফার্মেশন বায়াস*। এই প্রবণতা আমাদের বিপরীত তথ্য উপেক্ষা করতে এবং নিজের ধারণার পক্ষে থাকা বক্তব্যগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য করতে পারে।তবে মনে রাখতে হবে, বারবার দেখা প্রতিটি তথ্যই মিথ্যা নয়। কোনো সত্য তথ্যও বহুবার প্রচারিত হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুনরাবৃত্তি তথ্যের সত্যতা প্রমাণ করে না। কোনো দাবি সত্য কি না, তা নির্ভর করে তার পক্ষে থাকা প্রমাণ, নির্ভরযোগ্য উৎস এবং তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতির ওপর। একটি খবর হাজারবার শেয়ার হলেও সেটি ভুল হতে পারে। আবার কোনো সত্য ঘটনা খুব কম মানুষের জানা থাকলেও সেটি সত্যই থাকতে পারে। জনপ্রিয়তা আর সত্যতার মধ্যে এই পার্থক্যটি বোঝা খুব জরুরি।
এই প্রবণতার প্রভাব শুধু সাধারণ খবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, রাজনীতি এবং ব্যক্তিগত জীবন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভুল তথ্য মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। কোনো চিকিৎসা সম্পর্কে ভুল দাবি বারবার দেখলে কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এড়িয়ে যেতে পারে। কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে যাচাইহীন অভিযোগ বারবার শুনলে মানুষ প্রমাণ ছাড়াই তাকে দোষী ভাবতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য বারবার প্রচারিত হলে সেই বক্তব্য মানুষের মনে পূর্বধারণা তৈরি করতে পারে। এভাবে একটি মিথ্যা দাবি শুধু একজন মানুষের বিশ্বাসকেই বদলায় না; কখনো কখনো মানুষের সম্পর্ক, সিদ্ধান্ত এবং সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রভাবিত করে।
তাহলে এই ফাঁদ থেকে বাঁচার উপায় কী?
প্রথমত, কোনো তথ্য বারবার দেখলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। বরং নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, তথ্যটির মূল উৎস কী? দ্বিতীয়ত, একই দাবির পক্ষে একাধিক স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য উৎস রয়েছে কি না, তা দেখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দশটি পৃষ্ঠা যদি একই অযাচাইকৃত পোস্ট থেকে তথ্য নিয়ে থাকে, তাহলে সেটি দশটি স্বাধীন প্রমাণ নয়। তৃতীয়ত, কোনো খবর খুব আবেগপূর্ণ হলে বা সেটি দেখে সঙ্গে সঙ্গে রাগ, ভয় কিংবা উত্তেজনা তৈরি হলে একটু থামা দরকার। কারণ আবেগের মুহূর্তে আমরা অনেক সময় যাচাই না করেই তথ্য ভাগ করে ফেলি। চতুর্থত, তথ্যটি পুরোনো কি না, ছবিটি অন্য কোনো ঘটনার কি না এবং শিরোনামের সঙ্গে মূল প্রতিবেদনের মিল আছে কি না, সেগুলোও পরীক্ষা করা উচিত। আর কোনো দাবি যাচাই করতে না পারলে সেটিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের বিশ্বাসের বিপরীত তথ্য দেখলেও সেটিকে সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাখ্যান না করা। আমরা সবাই ভুল করতে পারি। কোনো তথ্য আগে বিশ্বাস করেছি বলে সারাজীবন সেটিকে আঁকড়ে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। নতুন প্রমাণ পাওয়া গেলে নিজের ধারণা সংশোধন করতে পারা দুর্বলতা নয়; বরং এটি সচেতন চিন্তার পরিচয়।
শেষ পর্যন্ত ইন্টারনেটে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্য চেনার দক্ষতা সবার সমান নয়। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মিথ্যা তথ্যও সত্যের মতো দেখতে হতে পারে, আর একই কথা বারবার শুনতে শুনতে সেটিকে বাস্তব বলে মনে হতে পারে। তাই শুধু কী দেখছি, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; কেন বিশ্বাস করছি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।মনে রেখো, কোনো কথা বারবার বললেই সত্য হয়ে যায় না, হাজার মানুষ বিশ্বাস করলেই প্রমাণ তৈরি হয় না, আর পরিচিত মনে হলেই কোনো তথ্য নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে না। সত্য যাচাই করতে হয় প্রমাণ দিয়ে, মানুষের সংখ্যা দিয়ে নয়।
This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community