প্রকৃতি কি আগে থেকেই বিপদের সংকেত বুঝতে পারে?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
কখনো কি এমন গল্প শুনেছেন, যেখানে ভূমিকম্প হওয়ার আগে কুকুর অস্থির হয়ে ঘেউ ঘেউ করতে শুরু করেছে, পাখিরা হঠাৎ দল বেঁধে উড়ে গেছে, গবাদিপশু অস্বাভাবিক আচরণ করেছে কিংবা মাটির নিচে থাকা কিছু প্রাণী নিজেদের স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে? এমন ঘটনা বহু বছর ধরে মানুষের কৌতূহল বাড়িয়ে চলেছে। অনেকেই মনে করেন, প্রাণীরা হয়তো ভূমিকম্প হওয়ার আগেই বিপদের সংকেত বুঝতে পারে, অথচ মানুষ তা বুঝতে পারে না। বিষয়টি শুনতে রহস্যময় মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে প্রাণীদের ইন্দ্রিয়, পরিবেশের পরিবর্তন এবং বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানের এক জটিল গল্প। কিন্তু সত্যিই কি প্রাণীরা ভূমিকম্পের আগে থেকেই জানে কখন মাটি কেঁপে উঠবে? নাকি কিছু ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে বলেই আমরা সেগুলোকে বিশেষ ক্ষমতা বলে মনে করি?প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—কিছু প্রাণী ভূমিকম্পের আগে অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া গেলেও, প্রাণীরা নির্ভরযোগ্যভাবে ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে পারে, এমন কোনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই। অর্থাৎ প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণা চলছে, কিন্তু তাদের আচরণ দেখে নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও মাত্রার ভূমিকম্প আগে থেকে বলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো ঘটনার আগে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যাওয়া আর সেই আচরণকে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস হিসেবে ব্যবহার করা এক বিষয় নয়।তাহলে প্রাণীদের আচরণ নিয়ে এত আলোচনা কেন? এর একটি কারণ হলো, অনেক প্রাণীর ইন্দ্রিয় মানুষের তুলনায় ভিন্নভাবে কাজ করে। কুকুর মানুষের তুলনায় অনেক সূক্ষ্ম গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। কিছু প্রাণী খুব মৃদু শব্দ শুনতে পারে, আবার কিছু প্রাণী মাটির কম্পন বা আশপাশের পরিবেশের সূক্ষ্ম পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল। ফলে এমন কোনো পরিবর্তন যা মানুষ সহজে বুঝতে পারে না, সেটি কোনো প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো পরিবর্তন অনুভব করতে পারা মানেই যে প্রাণীটি আসন্ন ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বুঝে ফেলেছে, তা নয়।ধরুন, একটি কুকুর হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠল, বারবার ঘরের দরজার দিকে ছুটল কিংবা অস্বাভাবিকভাবে ডাকতে শুরু করল। এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। আশপাশের কোনো প্রাণীর উপস্থিতি, অপরিচিত গন্ধ, দূরের শব্দ, আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা শারীরিক অস্বস্তিও এমন আচরণের কারণ হতে পারে। পরে যদি ভূমিকম্প ঘটে, তাহলে মানুষ আগের সেই ঘটনাটিকে ভূমিকম্পের সংকেত হিসেবে মনে রাখতে পারে। কিন্তু একই ধরনের অস্থিরতা যদি শত শত দিন ঘটে এবং কোনো ভূমিকম্প না হয়, সেসব ঘটনা সাধারণত মানুষের স্মৃতিতে ততটা জায়গা পায় না। এই প্রবণতাকে বলা যায় নির্বাচিত স্মৃতি—আমরা অনেক সময় মিলে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে রাখি, কিন্তু না-মেলা ঘটনাগুলো ভুলে যাই।তবে প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণার আগ্রহ একেবারে ভিত্তিহীন নয়। বিজ্ঞানীরা জানতে চান, ভূমিকম্পের আগে কোনো কোনো অঞ্চলে পরিবেশের এমন পরিবর্তন ঘটে কি না, যা প্রাণীরা মানুষের আগে অনুভব করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে মাটির খুব ক্ষুদ্র কম্পন, ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তন, গ্যাস নির্গমনের পরিবর্তন কিংবা বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় পরিবেশের সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এসব পরিবর্তন সব ভূমিকম্পের আগে ঘটে, কিংবা প্রাণীরা নিয়মিতভাবে সেগুলো শনাক্ত করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো যথেষ্ট নয়।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার পরও অনেক সময় মানুষ কম্পন অনুভব করার আগেই কিছু প্রাণী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এর কারণ বোঝার জন্য জানতে হবে ভূমিকম্পের সময় পৃথিবীর ভেতরে কী ঘটে। ভূগর্ভে শিলাস্তরের হঠাৎ সরে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের ভূকম্পন তরঙ্গ তৈরি হয়। এর মধ্যে প্রাথমিক তরঙ্গ বা পি-তরঙ্গ সাধারণত দ্রুত চলাচল করে, কিন্তু তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে। পরে আসা এস-তরঙ্গ ও অন্যান্য তরঙ্গ অনেক সময় বেশি তীব্র ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। কিছু প্রাণী মাটির সূক্ষ্ম কম্পন আগে টের পেতে পারে, আর মানুষ হয়তো শক্তিশালী ঝাঁকুনি আসার পর বিষয়টি বুঝতে পারে। ফলে কোনো প্রাণীকে ভূমিকম্পের আগে অস্থির হতে দেখা গেলেও সেটি আসলে ভূমিকম্পের প্রাথমিক তরঙ্গের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রাণীটি ভবিষ্যৎ জানতে পারেনি; বরং কম্পনের এমন একটি সংকেত অনুভব করেছে, যা মানুষ তখনো বুঝতে পারেনি।পাখিদের আচরণ নিয়েও মানুষের কৌতূহল কম নয়। কখনো কখনো ভূমিকম্পের আগে পাখিদের হঠাৎ উড়ে যাওয়া, দলবদ্ধভাবে স্থান পরিবর্তন করা কিংবা বাসস্থানে ফিরে না আসার গল্প শোনা যায়। কিন্তু পাখিরা এমন আচরণ আবহাওয়ার পরিবর্তন, শিকারির উপস্থিতি, খাবারের সন্ধান কিংবা অন্য পাখিদের চলাচলের কারণেও করতে পারে। কোনো একটি ঘটনা ভূমিকম্পের সঙ্গে মিলে গেলেই প্রমাণ হয় না যে পাখিরা আগেই ভূমিকম্প বুঝতে পেরেছিল। বিষয়টি নিশ্চিত করতে হলে ভূমিকম্পের আগে ও পরে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের আচরণের তথ্য সংগ্রহ করে তুলনা করতে হবে।গবাদিপশু, সাপ, ব্যাঙ কিংবা মাটির কাছাকাছি বসবাসকারী অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো প্রাণী যদি পরিবেশের সামান্য পরিবর্তনে সাড়া দেয়, তাহলে তার আচরণ বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাঙের মতো উভচর প্রাণীর জীবনযাত্রা তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং পানির গুণমানের ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা গেলে পরিবেশগত কারণগুলোও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সাপ বা অন্য প্রাণীর অস্বাভাবিক চলাচলের ক্ষেত্রেও আশপাশের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আবাসস্থল এবং খাদ্যের প্রাপ্যতার মতো বিষয় বিবেচনা করতে হয়।বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে আরও উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। প্রাণীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ, তাদের শরীরে স্থাপন করা বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে কার্যকলাপের তথ্য সংগ্রহ, ক্যামেরায় আচরণ রেকর্ড করা এবং একই সময়ের ভূকম্পন ও পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। কোনো প্রাণী ভূমিকম্পের আগে অস্বাভাবিক আচরণ করলে গবেষকেরা দেখার চেষ্টা করেন, ঘটনাটি কতবার ঘটেছে, অন্য ভূমিকম্পের আগেও এমন হয়েছিল কি না এবং ভূমিকম্প না ঘটলেও একই আচরণ দেখা যায় কি না। এভাবে বহু ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করলেই বোঝা সম্ভব, প্রাণীদের আচরণের সঙ্গে ভূমিকম্পের সত্যিই কোনো নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক আছে কি না।এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া। একটি কার্যকর পূর্বাভাসের জন্য শুধু সম্ভাব্য বিপদের কথা বললেই চলে না; কখন, কোথায় এবং কী মাত্রার ভূমিকম্প ঘটতে পারে, সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। কোনো প্রাণী একদিন অস্থির হয়ে উঠল আর পরদিন ভূমিকম্প হলো—এমন কয়েকটি ঘটনা এই মানদণ্ড পূরণ করে না। কারণ পৃথিবীতে প্রতিদিনই বহু প্রাণী অস্বাভাবিক আচরণ করে, আবার অনেক ভূমিকম্পের আগে প্রাণীদের মধ্যে কোনো সুস্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যায় না। তাই বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া প্রাণীদের আচরণকে ভূমিকম্পের সতর্কসংকেত হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে।তবুও এই প্রশ্নটি আমাদের একটি সুন্দর শিক্ষা দেয়। প্রকৃতির সঙ্গে প্রাণীদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তারা এমন অনেক পরিবেশগত সংকেত অনুভব করতে পারে, যা মানুষের ইন্দ্রিয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়। এই ক্ষমতাগুলো নিয়ে গবেষণা করলে শুধু প্রাণীদের আচরণ সম্পর্কেই নয়, পৃথিবীর পরিবর্তন সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানা সম্ভব। হয়তো ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা প্রাণীদের আচরণের এমন কোনো নির্দিষ্ট ধরন আবিষ্কার করবেন, যা ভূমিকম্পসংক্রান্ত গবেষণায় সহায়ক হবে। তবে সেই সম্ভাবনাকে আজকের নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।সবশেষে মনে রাখতে হবে, ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যার সঠিক সময় ও স্থান আগে থেকে নির্ধারণ করা এখনো বিজ্ঞানের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই কুকুরের অস্থিরতা, পাখির হঠাৎ উড়ে যাওয়া কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর আচরণ দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভবন নির্মাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জরুরি প্রস্তুতি রাখা এবং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ও সরকারি সতর্কবার্তার ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।প্রকৃতির প্রতিটি আচরণের পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে, আর সেই কারণ খুঁজে বের করাই বিজ্ঞানের কাজ। প্রাণীরা ভূমিকম্পের আগে কী অনুভব করে, আদৌ কোনো নির্ভরযোগ্য সংকেত শনাক্ত করতে পারে কি না—এই রহস্যের সব উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই। আর এখানেই বিজ্ঞান সবচেয়ে সুন্দর: যে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা, সেটিকে কুসংস্কার দিয়ে পূরণ না করে প্রমাণের সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা। হয়তো ভবিষ্যতের কোনো আবিষ্কার আমাদের এই রহস্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দেবে। ততদিন পর্যন্ত প্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণকে কৌতূহলের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত ভূমিকম্পের পূর্বাভাস হিসেবে নয়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community