মৌমাছি কীভাবে অন্য মৌমাছিকে খাবারের অবস্থান বোঝায়?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
ফুলে ভরা একটি বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে কখনো কি দেখেছেন, একটি মৌমাছি কোথা থেকে যেন এসে হঠাৎ চাকের ভেতরে ঢুকে গেল, আর কিছুক্ষণ পর একের পর এক মৌমাছি একই দিকের দিকে উড়ে যেতে শুরু করল? বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, তারা হয়তো কোনো অদৃশ্য সংকেত পেয়েছে। কিন্তু আসলে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর। মৌমাছিদের মধ্যে এমন এক অসাধারণ যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে, যার সাহায্যে একটি মৌমাছি অন্যদের জানাতে পারে কোথায় খাবার আছে, খাবারটি কতটা দূরে এবং কোন দিকে যেতে হবে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো—এই তথ্য জানানোর জন্য তাদের মানুষের মতো কথা বলার প্রয়োজন হয় না। শরীরের বিশেষ নড়াচড়া, গন্ধ এবং পরিবেশের বিভিন্ন সংকেত মিলিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেয়।মৌমাছির এই যোগাযোগব্যবস্থার সবচেয়ে বিখ্যাত অংশ হলো নৃত্য। বিশেষ করে মধু মৌমাছি যখন বাইরে গিয়ে কোনো ভালো ফুলের উৎস খুঁজে পায়, তখন সে শুধু নিজের জন্য খাবার সংগ্রহ করে ফিরে আসে না। চাকের ভেতরে ফিরে এসে সে অন্য কর্মী মৌমাছিদের কাছে সেই খাবারের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। এর জন্য সে যে বিশেষ নড়াচড়া করে, সেটিকে বিজ্ঞানীরা ওয়্যাগল নৃত্য নামে চিহ্নিত করেছেন। নামটি শুনতে মজার হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অবিশ্বাস্য পরিমাণ তথ্য।ধরুন, একটি মৌমাছি অনেক দূরে গিয়ে এমন একটি জায়গা খুঁজে পেল যেখানে প্রচুর ফুল ফুটেছে এবং সেখানে প্রচুর মধুরস পাওয়া যাচ্ছে। সে সেই জায়গা থেকে কিছু মধুরস সংগ্রহ করে চাকের কাছে ফিরে আসে। এরপর অন্য মৌমাছিদের সামনে একটি নির্দিষ্ট ধরনের নড়াচড়া করতে শুরু করে। সে শরীর দুলিয়ে একটি নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে যায়, তারপর ফিরে আসে এবং আবার একই নড়াচড়া করে। এই নাচের ধরন ও দিকের মাধ্যমে সে খাবারের অবস্থান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।এখানে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নাচ শুধু “খাবার আছে” এমন একটি সাধারণ বার্তা নয়। মৌমাছির নাচের একটি অংশ খাবারের দিক বোঝাতে সাহায্য করে। চাকের ভেতরের অন্ধকার পরিবেশে মৌমাছিরা সরাসরি আকাশ দেখে দিক নির্ধারণ করতে পারে না। তাই নাচের দিকটি সূর্যের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংকেত হিসেবে কাজ করে। বাইরে থাকা সূর্যকে যেন তারা চাকের ভেতরের অন্ধকারেও এক ধরনের অদৃশ্য দিকনির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করে।আর খাবার কত দূরে—সেটিও নাচের মাধ্যমে বোঝানো যেতে পারে। মৌমাছি কতক্ষণ ধরে তার দেহের নির্দিষ্ট অংশ দুলিয়ে এগোচ্ছে এবং পুরো নাচটি কতটা সময় নিচ্ছে, তার সঙ্গে খাবারের দূরত্বের সম্পর্ক থাকে। সাধারণভাবে খাবারের উৎস যত দূরে, সংকেতের ধরন তত বেশি সময় ও পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ একটি ছোট্ট মৌমাছি তার কয়েক সেকেন্ডের নড়াচড়ার মধ্যেই অন্যদের কাছে এমন তথ্য পৌঁছে দিতে পারে, যা আমাদের কাছে একটি পুরো মানচিত্রের মতো।ভাবুন, একজন মানুষ যদি আপনাকে বলে, “ওই দিকে একটা দোকান আছে”—তাহলে আপনার আরও প্রশ্ন থাকবে। কত দূরে? কোন দিকে? কোন রাস্তা দিয়ে যেতে হবে? কিন্তু মৌমাছিদের ক্ষেত্রে যোগাযোগের ব্যবস্থা অনেক বেশি সূক্ষ্ম। একটি সফল খাবারের উৎসের তথ্য অন্য কর্মী মৌমাছিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তারা সেই নির্দেশনা অনুসরণ করে ফুলের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।তবে শুধু নাচ দেখেই মৌমাছিরা সবকিছু বুঝে ফেলে—বিষয়টি এতটা সরল নয়। খাবারের গন্ধও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। খাবারের উৎস থেকে ফিরে আসা মৌমাছির শরীরে বা তার সংগৃহীত মধুরসে সেই ফুলের গন্ধের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। অন্য মৌমাছিরা সেই গন্ধ ব্যবহার করে বুঝতে পারে কোন ধরনের ফুলের দিকে তাদের খুঁজতে হবে। ফলে দিক ও দূরত্বের তথ্যের পাশাপাশি গন্ধ তাদের সঠিক উৎস শনাক্ত করতেও সাহায্য করে।আরও চমৎকার বিষয় হলো, মৌমাছিদের এই পুরো ব্যবস্থা কোনো একজন নেতা বসে পরিচালনা করেন না। চাকের মধ্যে কোনো “প্রধান মৌমাছি” মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে সবাইকে নির্দেশ দেয় না। বরং অসংখ্য মৌমাছি নিজেদের ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে পুরো উপনিবেশকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিণত করে। কেউ খাবার খুঁজে আনে, কেউ নাচের মাধ্যমে তথ্য ছড়ায়, কেউ সেই তথ্য অনুসরণ করে নতুন উৎস যাচাই করে, আবার কেউ খাবার সংগ্রহ করে চাকের ভেতরে ফিরিয়ে আনে।এখানে একটা মানবিক বিষয়ও খুঁজে পাওয়া যায়। একটি মৌমাছি চাইলে হয়তো শুধু নিজের প্রয়োজনের জন্য খাবার খুঁজে ফিরে আসতে পারত। কিন্তু তার আচরণ পুরো দলের জন্য উপকারী হয়ে ওঠে। সে যে জায়গায় খাবার পেয়েছে, সেই তথ্য অন্যদের কাছে পৌঁছে দেয়। অর্থাৎ একটি মৌমাছির অভিজ্ঞতা খুব দ্রুত পুরো সমাজের সম্পদে পরিণত হয়। প্রকৃতির ক্ষুদ্র এই প্রাণীদের জীবনেও যেন “আমি”র চেয়ে “আমরা” অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তবে মৌমাছিদের যোগাযোগ সবসময় নিখুঁতভাবে কাজ করে এমন নয়। আবহাওয়া, বাতাস, সূর্যের অবস্থান, ফুলের পরিবর্তন এবং খাবারের উৎসের অবস্থার ওপর তাদের অনুসন্ধান নির্ভর করতে পারে। কোনো ফুলের উৎস শুকিয়ে গেলে বা সেখানে খাবার কমে গেলে আগের তথ্য আর কার্যকর থাকে না। তখন নতুন অনুসন্ধান প্রয়োজন হয় এবং মৌমাছিরা নতুন উৎস খুঁজে বের করতে পারে। অর্থাৎ তাদের যোগাযোগব্যবস্থা শুধু তথ্য সংরক্ষণ করে না, পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গেও মানিয়ে নেয়।মৌমাছির এই নাচ নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বহুদিনের। কারণ এটি শুধু প্রাণীর আচরণের একটি সুন্দর উদাহরণ নয়; এর মধ্যে রয়েছে তথ্য আদান-প্রদান, দিক নির্ণয়, দূরত্বের ধারণা এবং দলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের অসাধারণ সমন্বয়। একটি ছোট্ট প্রাণী তার শরীরের নড়াচড়াকে যেন একটি ভাষায় পরিণত করেছে। মানুষের ভাষায় যেখানে শব্দ দিয়ে তথ্য প্রকাশ করা হয়, সেখানে মৌমাছি শরীরের ছন্দকে তথ্যের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, চাকের ভেতরের অন্ধকারে কয়েকটি মৌমাছির নড়াচড়া আমাদের চোখে হয়তো নিছক অদ্ভুত আচরণ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই নড়াচড়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে—“ওদিকে যাও”, “সেখানে ফুল আছে”, “জায়গাটা এতটা দূরে”, “এই ধরনের ফুল খুঁজে দেখো”—এরকম গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। আমরা যে নাচকে শুধু নাচ হিসেবে দেখি, প্রকৃতির কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে একটি কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা।তাই পরেরবার কোনো ফুলের ওপর মৌমাছিকে দেখতে পেলে একটু অন্যভাবে ভাবুন। সে হয়তো শুধু ফুল থেকে মধুরস সংগ্রহ করছে না; হয়তো সে এমন একটি তথ্য সংগ্রহ করছে, যা কিছুক্ষণ পর তার পুরো দলের কাজে লাগবে। আর যখন সে চাকের ভেতরে ফিরে গিয়ে শরীর দুলিয়ে নড়াচড়া শুরু করবে, তখন সেই ছোট্ট নাচের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে থাকবে একটি অদৃশ্য মানচিত্র—যেখানে আছে দিক, দূরত্ব, খাবারের উৎস এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় এক অসাধারণ দলগত জ্ঞান। প্রকৃতি কখনো কখনো কথা বলে শব্দ দিয়ে নয়; কখনো সে কথা বলে গন্ধে, কখনো আলোতে, আর কখনো একটি ছোট্ট মৌমাছির নাচে।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

