পিঁপড়েরা কীভাবে খাবারের রাস্তা মনে রাখে?

in আমার বাংলা ব্লগ • 5 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



একটা ছোট্ট পিঁপড়েকে কখনো খুব মন দিয়ে দেখেছেন? রান্নাঘরের কোণে সামান্য খাবারের কণা পড়ে আছে, আর কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একটার পর একটা পিঁপড়ে ঠিক সেই জায়গায় চলে আসছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো—তারা যেন জানেই কোথায় খাবার আছে! অথচ তাদের হাতে কোনো মানচিত্র নেই, চোখের সামনে কোনো রাস্তার চিহ্নও নেই, আর আমাদের মতো স্মার্টফোনে অবস্থান দেখার কোনো ব্যবস্থা তো দূরের কথা। তাহলে প্রশ্ন আসে, পিঁপড়েরা কীভাবে খাবারের রাস্তা মনে রাখে? তারা কি সত্যিই রাস্তা “মনে রাখে”, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও চমৎকার কোনো প্রাকৃতিক ব্যবস্থা?পিঁপড়েদের খাবারের পথ খুঁজে পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রহস্য হলো ফেরোমোন নামের রাসায়নিক সংকেত। কোনো পিঁপড়ে খাবারের সন্ধান পেলে সে শুধু খাবার খেয়ে ফিরে আসে না; ফেরার সময় পথের ওপর বিশেষ ধরনের রাসায়নিক পদার্থের গন্ধ রেখে যেতে পারে। এই গন্ধকে অনুসরণ করেই অন্য পিঁপড়েরা খাবারের জায়গায় পৌঁছাতে শুরু করে। বিষয়টি অনেকটা এমন—একজন মানুষ অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পথের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট চিহ্ন রেখে গেল, পরে অন্যরা সেই চিহ্ন অনুসরণ করে একই জায়গায় পৌঁছে গেল। তবে পিঁপড়েদের ক্ষেত্রে সেই চিহ্ন চোখে দেখা যায় না, বরং রাসায়নিক সংকেত হিসেবে কাজ করে।তবে এখানেই পুরো রহস্য শেষ নয়। কারণ শুধু গন্ধের রাস্তা থাকলেই তো হবে না। পিঁপড়েদের নিজেদের অবস্থান বোঝারও প্রয়োজন হয়। অনেক প্রজাতির পিঁপড়ে সূর্যের অবস্থান, আলো-ছায়ার পার্থক্য এবং আশপাশের পরিবেশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে নিজের পথ নির্ধারণ করতে পারে। কিছু পিঁপড়ে হাঁটার দূরত্বও হিসাব করতে পারে। অর্থাৎ তারা যেন এক ধরনের ছোট্ট প্রাকৃতিক “দিকনির্দেশ ব্যবস্থা” নিয়ে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়।ভাবুন, একটি পিঁপড়ে প্রথমবার কোনো খাবারের সন্ধান পেল। সে খাবার নিয়ে নিজের বাসার দিকে ফিরছে। ফেরার সময় সে রাসায়নিক সংকেত রেখে যেতে পারে। অন্য পিঁপড়েরা সেই সংকেত পেয়ে একই পথ ধরে খাবারের দিকে যায়। তারা খাবার সংগ্রহ করে আবার বাসায় ফিরে আসে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেই পথকে আরও শক্তিশালী করে। ফলে একই রাস্তা দিয়ে যত বেশি পিঁপড়ে যাতায়াত করে, সেই রাসায়নিক পথ তত বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। এভাবেই অল্প সময়ের মধ্যে একটি ছোট্ট পিঁপড়ের দল খাবারের জায়গার সঙ্গে তাদের বাসার মধ্যে একটি কার্যকর পথ তৈরি করে ফেলে।এখানে একটি মজার ব্যাপার আছে। পিঁপড়েরা সাধারণত কোনো একজন “নেতা”কে অনুসরণ করে দলবদ্ধভাবে হাঁটে না। বরং প্রত্যেকটি পিঁপড়ে নিজের মতো করে পরিবেশের সংকেত অনুসরণ করে। কোনো পিঁপড়ে ভালো খাবারের উৎস খুঁজে পেলে তার রেখে যাওয়া রাসায়নিক সংকেত অন্যদের প্রভাবিত করতে পারে। আবার অন্য পিঁপড়েরাও সেই পথে চলতে গিয়ে নতুন সংকেত যোগ করে। ফলে পুরো দলটি যেন কোনো কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ছাড়াই একটি সংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি করে।এই কারণেই পিঁপড়েদের চলাচল অনেক সময় আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য রকমের শৃঙ্খলাবদ্ধ মনে হয়। রান্নাঘরের মেঝেতে হয়তো খাবারের একটি ছোট কণা পড়ে আছে। প্রথমে একটি পিঁপড়ে সেটি খুঁজে পেল। এরপর কয়েকটি পিঁপড়ে এল। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল একই জায়গায় অনেক পিঁপড়ের লাইন। মনে হতে পারে, কেউ যেন তাদের খবর দিয়ে দিয়েছে। আসলে এক অর্থে খবর পৌঁছেছে ঠিকই—তবে মানুষের মতো কথা বলে নয়, রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে।আরেকটি চমৎকার বিষয় হলো, পিঁপড়েরা সবসময় একই রাস্তা ব্যবহার করে না। কোনো রাস্তা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তারা বিকল্প পথ খুঁজে নিতে পারে। ধরুন, খাবারের দিকে যাওয়ার একটি পথের মাঝখানে আপনি কোনো বস্তু রেখে দিলেন। কিছু পিঁপড়ে হয়তো সেই বাধার সামনে গিয়ে থামবে, তারপর ডান বা বাঁ দিক দিয়ে ঘুরে নতুন পথ খুঁজতে শুরু করবে। নতুন পথ কার্যকর হলে সেখানে আবার রাসায়নিক সংকেত তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ তাদের পথ-ব্যবস্থা স্থির নয়; পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেটি বদলাতে পারে।পিঁপড়েদের এই আচরণ থেকে বিজ্ঞানীরা মানুষের প্রযুক্তির জন্যও অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। বিশেষ করে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে বিভিন্ন পথ খোঁজার সমস্যার সমাধানে পিঁপড়েদের আচরণ থেকে ধারণা নিয়ে পিঁপড়া-উপনিবেশভিত্তিক অ্যালগরিদম তৈরি করা হয়েছে। বিশাল সংখ্যক সম্ভাব্য পথের মধ্যে কোন পথটি তুলনামূলকভাবে ভালো, সেটি খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে এই ধারণা কাজে লাগানো যায়। অর্থাৎ আমাদের চোখে যে ক্ষুদ্র প্রাণীটি রান্নাঘরের মেঝেতে খাবারের টুকরো খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার আচরণ থেকেই মানুষ জটিল গণনাগত সমস্যার সমাধানের ধারণা পেয়েছে!তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার—পিঁপড়েরা মানুষের মতো করে কোনো রাস্তার মানচিত্র মাথায় রেখে দেয়, এমনটা বলা ঠিক নয়। তাদের পথ খোঁজার ক্ষমতা প্রজাতিভেদে আলাদা এবং এর পেছনে রাসায়নিক সংকেত, পরিবেশের বৈশিষ্ট্য, সূর্যের অবস্থান, দূরত্বের হিসাব এবং অভিজ্ঞতার মতো একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে। অর্থাৎ তাদের “স্মৃতি” আমাদের স্মৃতির মতো নয়। বরং তাদের শরীর ও আচরণের বিভিন্ন প্রাকৃতিক ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে তাদের সঠিক পথে চলতে সাহায্য করে।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, একটি পিঁপড়ে একা যতটা করতে পারে, পুরো উপনিবেশ একসঙ্গে তার চেয়ে অনেক বেশি করতে পারে। একটি পিঁপড়ে হয়তো শুধু খাবারের ছোট্ট একটি কণা খুঁজে পেল। কিন্তু সেই তথ্য যখন রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে অন্যদের কাছে পৌঁছাল, তখন সেটি একটি পুরো দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। এখানে কোনো পিঁপড়ে হয়তো “সবচেয়ে বুদ্ধিমান” নয়, কিন্তু সবাই মিলে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করে যা বাইরে থেকে দেখলে অবিশ্বাস্য রকমের বুদ্ধিমান বলে মনে হয়।আমরা অনেক সময় বড় প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা দেখে বিস্মিত হই। কিন্তু প্রকৃতি কখনো কখনো তার সবচেয়ে অসাধারণ কৌশলগুলো লুকিয়ে রাখে সবচেয়ে ছোট প্রাণীদের মধ্যে। আমাদের পায়ের নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি পিঁপড়ে হয়তো এমন এক জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করছে, যার সম্পূর্ণ সৌন্দর্য আমরা খালি চোখে বুঝতেই পারি না।

তাই পরেরবার যখন দেখবেন এক সারি পিঁপড়ে একই পথে খাবারের দিকে যাচ্ছে, তখন শুধু “পিঁপড়ের লাইন” বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। একটু খেয়াল করে দেখবেন। সেই ছোট্ট সারির ভেতরেই হয়তো চলছে রাসায়নিক বার্তা আদান-প্রদান, পথ নির্বাচন, পরিবেশের সংকেত বিশ্লেষণ এবং দলগত সহযোগিতার এক অসাধারণ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। মানুষের তৈরি মানচিত্র ছাড়াই তারা পথ খুঁজে নেয়, কথা না বলেও তথ্য ভাগ করে নেয়, আর একজনের পাওয়া খাবারের সন্ধান মুহূর্তের মধ্যে পুরো দলের সম্পদে পরিণত হয়। সত্যি বলতে, পিঁপড়েদের পৃথিবী যত ছোট মনে হয়, তাদের জীবনযাত্রার বিজ্ঞান ততটাই বিস্ময়কর।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png