নিজের কথাই যদি কথা হয়, তাহলে অন্য মানুষটার অনুভূতির মূল্য কোথায়?

in আমার বাংলা ব্লগ • 2 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



কিছু মানুষ আছে, যারা সব সময় নিজের কথাটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারা কী বলেছে, কেন বলেছে, কীভাবে বলেছে—সেটার ব্যাখ্যা দিতে দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিতে পারে। কিন্তু যখন অন্য মানুষটি নিজের কষ্টের কথা বলতে যায়, নিজের অনুভূতিগুলো বোঝাতে চায়, তখন তাদের হাতে যেন আর সময় থাকে না। তারা মাঝপথে থামিয়ে দেয়, নিজের যুক্তি দেখায়, পুরোনো ঘটনা টেনে আনে, কিংবা এমনভাবে কথা বলে যেন পৃথিবীর সব ভুল অন্য মানুষের, আর তারা নিজেরা সব সময় নির্দোষ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা নিজেদের জায়গা থেকে সবকিছু বিচার করে ফেলে, কিন্তু একবারও ভাবে না, অন্য মানুষটির জায়গায় দাঁড়ালে ঘটনাটা কেমন দেখাত! তখন মনে হয়, এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ সম্পর্ক তৈরি করতে জানে, কথা বলতে জানে, নিজের অধিকার বুঝতে জানে, কিন্তু অন্য একজন মানুষকে বোঝার মানসিকতা অর্জন করতে পারে না।আসলে মানুষ যখন কোনো ঘটনার সঙ্গে নিজের আবেগকে জড়িয়ে ফেলে, তখন অনেক সময় সে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করতে পারে না। তার কাছে নিজের কষ্টটাই সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, নিজের অপমানটাই সবচেয়ে সত্য মনে হয়, নিজের যুক্তিটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়। সে ভুলে যায়, একই ঘটনায় দুজন মানুষ ভিন্নভাবে কষ্ট পেতে পারে। একজনের কাছে যে কথাটা সামান্য, অন্যজনের কাছে সেটাই হয়তো অনেক দিনের জমে থাকা অভিমানের কারণ। একজন যে আচরণকে স্বাভাবিক মনে করছে, অন্যজন হয়তো সেই আচরণের কারণে প্রতিদিন নিজেকে অবহেলিত অনুভব করছে। অথচ নিজের অনুভূতিকে সত্য প্রমাণ করতে গিয়ে অনেকে অন্য মানুষের অনুভূতিকেই মিথ্যা বানিয়ে দেয়। যেন কষ্ট পাওয়ার অধিকার শুধু তার নিজের, অন্য মানুষের কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারে না।সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় তখন, যখন আপনি কাউকে বোঝানোর জন্য নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেন, অথচ সে আপনাকে বোঝার জন্য সামান্য সময়টুকুও দিতে চায় না। আপনি হয়তো অনেক ভেবেচিন্তে কথাগুলো বলেন, যেন আপনার কথায় সে আবার কষ্ট না পায়। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করেন, নিজের অভিমান চেপে রাখেন, এমনকি অনেক সময় নিজের অবস্থান থেকেও সরে আসেন, শুধু সম্পর্কটা যেন নষ্ট না হয়। কিন্তু এত কিছুর পরও যখন দেখেন, আপনার কথাগুলো তার কাছে কোনো গুরুত্বই পাচ্ছে না, তখন ভেতরে ভেতরে একধরনের ক্লান্তি জন্ম নেয়। মনে হয়, আমি কি সত্যিই এতটাই অগুরুত্বপূর্ণ যে আমার অনুভূতিগুলো শোনার প্রয়োজনও কেউ অনুভব করে না? আমি কি শুধু অন্যের কথা বোঝার জন্যই আছি, নাকি আমারও কিছু বলার অধিকার রয়েছে? কিছু মানুষ কথা শোনে ঠিকই, কিন্তু বোঝার জন্য শোনে না। তারা অপেক্ষা করে কখন আপনি থামবেন, আর তারা আবার নিজের বক্তব্য শুরু করবে। আপনি একটি কথা বললে তারা তার উত্তর হিসেবে দশটি যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেবে। আপনি আপনার কষ্টের কথা বললে তারা মনে করিয়ে দেবে, তারাও কত কষ্ট পেয়েছে। আপনি কোনো ভুলের কথা তুলে ধরলে তারা পুরোনো ভুলের হিসাব খুলে বসবে। এভাবে আলোচনার আসল বিষয়টি হারিয়ে যায়, আর শুরু হয় কে বেশি সঠিক, কে বেশি কষ্ট পেয়েছে, কে বেশি ত্যাগ করেছে—সেই প্রতিযোগিতা। অথচ সম্পর্ক কোনো আদালত নয়, যেখানে প্রত্যেককে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে হবে। সম্পর্ক এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ নিজের দুর্বলতা নিয়েও কথা বলতে পারে, ভুল স্বীকার করতে পারে এবং ভয় ছাড়াই বলতে পারে, “তোমার এই আচরণে আমার কষ্ট হয়েছে।” কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করা সবার পক্ষে সহজ নয়। অনেকেই মনে করে, ভুল মেনে নিলে সম্মান কমে যাবে, নিজের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে কিংবা অন্য মানুষটি তাকে ছোট করে দেখবে। তাই তারা ভুলের ব্যাখ্যা দিতে দিতে একসময় ভুলটাকেই অস্বীকার করতে শুরু করে। কেউ কেউ আবার নিজের উদ্দেশ্যকে এত বেশি গুরুত্ব দেয় যে নিজের আচরণের প্রভাবটা বুঝতেই চায় না। তারা বলে, “আমি তো ওইভাবে বলতে চাইনি”, “আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না”, “তুমি ভুল বুঝেছ।” কিন্তু তারা একবারও ভাবে না, উদ্দেশ্য খারাপ না হলেও আচরণে অন্য কেউ কষ্ট পেতে পারে। আপনি কাউকে ইচ্ছা করে আঘাত না করলেও আপনার কথায় তার মন খারাপ হতে পারে। আর পরিণত মানসিকতা হলো নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি অন্য মানুষের অনুভূতিকেও গুরুত্ব দেওয়া।একটা সময় আসে, যখন বারবার বোঝাতে বোঝাতে মানুষ নিজের কথার ওপর থেকেই বিশ্বাস হারাতে শুরু করে। সে কথা বলার আগে দশবার ভাবে, এই কথাটা বললে আবার কী ব্যাখ্যা দিতে হবে, কোন কথার ভুল অর্থ করা হবে, কোথায় আবার নিজের অনুভূতির পক্ষে যুক্তি দেখাতে হবে। ধীরে ধীরে সে নিজের কষ্ট প্রকাশ করাই কমিয়ে দেয়। বাইরে থেকে তাকে শান্ত মনে হয়, কিন্তু সেই শান্তির পেছনে হয়তো জমে থাকে অনেক না-বলা কথা। সে আর তর্ক করতে চায় না, কারণ সে জানে, তর্ক করে নিজের অবস্থান বোঝানো গেলেও সব সময় অন্য মানুষের মন পর্যন্ত পৌঁছানো যায় না। তখন নীরবতা তার কাছে শান্তির চেয়ে সহজ একটি পথ হয়ে ওঠে। তবে এই নীরবতা সব সময় সম্মতির অর্থ বহন করে না; কখনো কখনো এটি শুধু বারবার ভুল বোঝা হওয়ার ক্লান্তি।একটা বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, নিজের কথা বলা অন্যায় নয়, নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও অন্যায় নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন নিজের অনুভূতির জন্য জায়গা রাখতে গিয়ে অন্য মানুষের অনুভূতির জায়গাটুকু পুরোপুরি দখল করে নেওয়া হয়। আপনি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনো ঘটনাকে সঠিক মনে করতেই পারেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে অন্য মানুষটির দৃষ্টিভঙ্গি অযৌক্তিক। আপনার অভিজ্ঞতা আপনার কাছে সত্য, তার অভিজ্ঞতাও তার কাছে সত্য। দুজনের অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে, অনুভূতি আলাদা হতে পারে, এমনকি একই ঘটনার ব্যাখ্যাও আলাদা হতে পারে। সম্পর্কের সৌন্দর্য হলো, এই পার্থক্যগুলোকে অস্বীকার না করে একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করা।তাই কারও সঙ্গে কথা বলার সময় শুধু এই প্রশ্নটি করবেন না, “আমি কীভাবে আমার কথাটা বোঝাব?” বরং নিজেকে এটাও জিজ্ঞেস করুন, “আমি কি তার কথাটা সত্যিই বোঝার চেষ্টা করছি?” কারণ কথা বলার দক্ষতা অনেকেরই আছে, কিন্তু মন দিয়ে শোনার ধৈর্য সবার নেই। অথচ অনেক সময় একটি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, দামি কোনো উপহার নয়, কিংবা বড় বড় ভালোবাসার কথা নয়; প্রয়োজন শুধু এমন একজন মানুষ, যে আপনার কথা শেষ হওয়ার আগেই আপনাকে বিচার করে বসবে না। যে আপনার কষ্ট শুনে নিজের কষ্টের হিসাব খুলে বসবে না। যে ভুল বোঝাবুঝি হলে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার আগে একবার ভাববে, কোথায় আপনাদের মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি হয়েছে।মনে রাখবেন, যে মানুষটি সব সময় নিজের কথাই বলে যায়, সে হয়তো অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু অন্যের মনের ভেতরে কী চলছে, তা জানার সুযোগ নিজেই হারিয়ে ফেলে। আর যে মানুষটি শুধু নিজের দিকটাই দেখে, সে হয়তো নিজের কাছে প্রতিবারই সঠিক থাকে, কিন্তু অন্যের চোখে ধীরে ধীরে দূরের মানুষ হয়ে উঠতে পারে। কারণ মানুষ শুধু ভুলের জন্য দূরে সরে যায় না; অনেক সময় দূরে সরে যায় এই অনুভূতি থেকে যে, তার কথা শোনার মতো কেউ নেই, তার কষ্ট বোঝার মতো কেউ নেই, তার অনুভূতিরও কোনো মূল্য নেই।সবচেয়ে তিক্ত সত্য হলো, আপনি যত সুন্দর করেই নিজের কথা বোঝান না কেন, যে মানুষটি বুঝতে চায় না, তার কাছে আপনার প্রতিটি ব্যাখ্যাই একসময় অজুহাত মনে হবে। আর যে মানুষটি সত্যিই বুঝতে চায়, তার কাছে আপনার অসম্পূর্ণ কথাগুলোর মধ্যেও কষ্টের ভাষা ধরা পড়বে।

তাই সব সময় নিজেকে সঠিক প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন না। কখনো কখনো একটু থামুন, অন্য মানুষটির কথাও শুনুন। কারণ একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য সব সময় বড় কোনো ঘটনা প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একজনের অবিরাম কথা আর অন্যজনের না-বলা কথাগুলোই যথেষ্ট। আর দিন শেষে মানুষ এমন কাউকেই পাশে চায় না, যে শুধু নিজের গল্প শোনাবে; মানুষ এমন কাউকে চায়, যার কাছে নিজের গল্পটাও নির্ভয়ে বলা যায়।


সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png

Sort:  

This post has been upvoted by @italygame witness curation trail


If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness




CLICK HERE 👇

Come and visit Italy Community