পাতা গাছ থেকে পড়ে সবসময় নিচেই যায় কিন্তু কিছু বীজ বাতাসে বহু দূরে যায় কীভাবে?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
শরতের বিকেলে কিংবা শীতের সকালে গাছের নিচ দিয়ে হাঁটার সময় আমরা প্রায়ই দেখি, হলুদ, লালচে বা শুকনো পাতাগুলো গাছ থেকে ঝরে মাটিতে পড়ে আছে। বাতাস একটু জোরে বইলে পাতাগুলোও উড়তে থাকে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মাটিতে নেমে আসে। অথচ একই গাছের আশপাশে এমন কিছু বীজ দেখা যায়, যেগুলো বাতাসে ভর করে অনেক দূরে চলে যায়। কোনো বীজ ছোট্ট পাখির মতো ডানা মেলে ঘুরতে ঘুরতে নামে, কোনোটি তুলার মতো নরম আঁশে ভর করে আকাশে ভাসে, আবার কোনোটি হেলিকপ্টারের পাখার মতো ঘুরতে ঘুরতে গাছ থেকে দূরে চলে যায়। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, একই প্রকৃতির মধ্যে থাকা পাতা আর বীজের চলার ধরন এত আলাদা কেন? এর পেছনে রয়েছে মাধ্যাকর্ষণ, বাতাসের প্রতিরোধ, বীজের গঠন এবং উদ্ভিদের বংশবিস্তারের এক বিস্ময়কর কৌশল।প্রথমেই বুঝতে হবে, পৃথিবী তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে সবকিছুকেই নিজের দিকে টানে। পাতা হোক কিংবা বীজ, দুটিই এই আকর্ষণের বাইরে নয়। তাহলে কিছু বীজ বাতাসে ভেসে এত দূরে যায় কীভাবে? এর উত্তর হলো, বাতাসের প্রতিরোধ এবং বীজের বিশেষ গঠন। কোনো বস্তু বাতাসের মধ্যে দিয়ে নিচে নামার সময় বাতাস তার গতির বিপরীতে বাধা সৃষ্টি করে। এই বাধাকে বলা হয় বায়ুর প্রতিরোধ। বস্তুটির আকৃতি, আয়তন, ভর, পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল এবং বাতাসের গতির ওপর নির্ভর করে এই প্রতিরোধ কতটা হবে। যেসব বীজের গঠন এমন যে তারা বাতাসের কাছ থেকে বেশি প্রতিরোধ পায়, সেগুলো তুলনামূলকভাবে ধীরে নিচে নামে। আর এই সময়টুকুতেই বাতাস তাদের অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে।এবার তুলনা করুন একটি শুকনো পাতা আর একটি ছোট বীজের। শুকনো পাতার পৃষ্ঠের ক্ষেত্রফল তুলনামূলকভাবে বড় হলেও সেটি অনেক সময় ভাঁজ হয়ে যায়, উল্টে যায় কিংবা বাতাসের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে নিচে নামে। পাতার গঠনও সব সময় বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকার উপযোগী নয়। অন্যদিকে, কিছু বীজের শরীরে এমন বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, যা তাদের পতনের গতি কমিয়ে দেয়। ফলে তারা শুধু নিচে পড়ে যাওয়ার পরিবর্তে বাতাসের স্রোতে ভেসে অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে সব পাতা দ্রুত নিচে পড়ে, আর সব বীজ দূরে যায়—বিষয়টি এমন নয়। শক্তিশালী বাতাসে শুকনো পাতাও অনেক দূর উড়ে যেতে পারে, আবার ভারী বীজ অল্প দূরেই মাটিতে পড়ে যায়।প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণগুলোর একটি হলো তুলার মতো নরম আঁশযুক্ত বীজ। অনেক গাছের বীজের সঙ্গে সূক্ষ্ম, হালকা এবং তুলার মতো আঁশ থাকে। এই আঁশগুলো বীজের চারপাশে বাতাস আটকে রাখতে সাহায্য করে এবং বাতাসের প্রতিরোধ বাড়ায়। ফলে বীজটি দ্রুত নিচে নামতে পারে না। বাতাসে ভাসমান অবস্থায় সেটি অনেকটা ছোট্ট পালকের মতো আচরণ করে। সামান্য বাতাসও তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। দূর থেকে দেখতে মনে হয়, আকাশে ছোট ছোট তুলোর টুকরো ভেসে বেড়াচ্ছে। অথচ সেই নরম তুলোর মতো অংশের ভেতরেই লুকিয়ে আছে একটি নতুন গাছের সম্ভাবনা।কিছু বীজ আবার ছোট্ট পাখার মতো গঠনের অধিকারী। উদাহরণ হিসেবে ম্যাপল গাছের বীজের কথা বলা যায়। এই বীজের সঙ্গে পাতলা, ডানার মতো একটি অংশ থাকে। বীজটি গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নামার সময় বাতাসের সঙ্গে এমনভাবে মিথস্ক্রিয়া করে যে এটি ঘুরতে ঘুরতে মাটির দিকে এগিয়ে যায়। অনেকটা খেলনা হেলিকপ্টারের মতো দেখতে এই পতনের ফলে বীজটির নিচে নামার গতি কমে যায়। বাতাস অনুকূলে থাকলে সেটি গাছের গোড়া থেকে বেশ দূরেও পৌঁছে যেতে পারে। প্রকৃতি যেন বীজের শরীরেই এমন এক ক্ষুদ্র উড়ন্ত যন্ত্র তৈরি করে দিয়েছে, যার কোনো জ্বালানি লাগে না, কোনো চালক লাগে না, অথচ কাজটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয় আবার কিছু বীজের গায়ে থাকে সূক্ষ্ম রোম বা চুলের মতো অংশ। এগুলো বীজকে হালকা রাখার পাশাপাশি বাতাসের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্র বাড়ায়। বাতাস যখন এই অংশগুলোর ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন বীজটি ধীরে ধীরে নিচে নামে। এ ধরনের বীজকে বাতাস সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, কিছু বীজের আকার এমন যে বাতাসের প্রবাহ তাদের ঘূর্ণায়মান বা দুলতে থাকা অবস্থায় নিচে নামতে সাহায্য করে। বীজের আকৃতির সামান্য পার্থক্যও তার চলার ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।এখন প্রশ্ন হলো, গাছ কেন এত কৌশল ব্যবহার করে বীজ ছড়িয়ে দেয়? এর মূল কারণ হলো বেঁচে থাকা এবং বংশবিস্তার। একটি গাছের সব বীজ যদি তার ঠিক নিচেই পড়ে, তাহলে নতুন চারাগুলোকে একই জায়গায় পানি, আলো, পুষ্টি এবং মাটির জন্য প্রতিযোগিতা করতে হবে। অনেক চারা পর্যাপ্ত আলো পাবে না, কিছু চারা বড় হওয়ার আগেই মারা যাবে। কিন্তু বীজ যদি বাতাসে ভর করে দূরে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে নতুন জায়গায় গাছ জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। কোনো বীজ উর্বর মাটিতে পড়তে পারে, কোনোটি খোলা জায়গায় পৌঁছাতে পারে, আবার কোনোটি অনুকূল পরিবেশ পেয়ে নতুন একটি গাছের জন্ম দিতে পারে। অর্থাৎ, বীজের দূরে ছড়িয়ে পড়া উদ্ভিদের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ায়।তবে বাতাসে দূরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আবহাওয়ারও বড় ভূমিকা রয়েছে। বাতাসের গতি বেশি হলে বীজ সাধারণত আরও দূরে যাওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু বাতাসের দিক, বৃষ্টিপাত, আর্দ্রতা, আশপাশের গাছপালা এবং ভূমির গঠনও এর যাত্রাকে প্রভাবিত করে। কোনো বীজ কয়েক মিটার দূরে গিয়ে পড়ে, আবার কোনো বীজ অনুকূল পরিস্থিতিতে আরও অনেক দূরে পৌঁছাতে পারে। প্রতিটি বীজের যাত্রা এক রকম নয়। কেউ সফলভাবে উপযুক্ত মাটিতে পৌঁছায়, কেউ পানিতে পড়ে, কেউ পাথুরে জায়গায় গিয়ে নষ্ট হয়। প্রকৃতির এই ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়ায় সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি রয়েছে অনিশ্চয়তাও।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, একটি ক্ষুদ্র বীজের মধ্যে লুকিয়ে থাকে বিশাল একটি গাছের সম্ভাবনা। সেই বীজ নিজে বাতাস তৈরি করতে পারে না, নিজের পথও ঠিক করতে পারে না। তবু তার গঠন এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যাতে প্রকৃতির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সে নিজের পরিচিত জায়গা ছেড়ে নতুন পরিবেশে পৌঁছাতে পারে। আর এই ঘটনাটি আমাদের দেখায়, বেঁচে থাকার জন্য সব সময় শক্তিশালী হওয়াই যথেষ্ট নয়; কখনো কখনো পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।তাই পরেরবার গাছ থেকে ঝরে পড়া পাতা কিংবা বাতাসে ভেসে যাওয়া কোনো বীজ দেখলে একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করবেন। দুটিই মাধ্যাকর্ষণের টানে নিচে নামছে, কিন্তু তাদের আকৃতি ও গঠনের কারণে যাত্রাটি এক রকম হচ্ছে না। শুকনো পাতা মাটিতে ফিরে আসে, আর কোনো কোনো বীজ বাতাসের স্রোতে ভর করে নতুন জায়গার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। প্রকৃতি এখানে শুধু বীজ ছড়িয়ে দিচ্ছে না; সে ভবিষ্যতের বন, ছায়া, ফুল আর ফলের সম্ভাবনাকেও ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের চোখে যা একটি ছোট্ট বীজের ভেসে যাওয়া, প্রকৃতির কাছে সেটিই হয়তো নতুন একটি জীবনের যাত্রার শুরু।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community