শীতের সকালে ঘাসের ওপর শিশির জমে, কিন্তু পাশের শুকনো জায়গায় জমে না কেন?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
প্রথমেই জানতে হবে, শিশির আসলে কী। আমরা অনেক সময় মনে করি, রাতের বেলা বাতাস থেকে সরাসরি পানি ঝরে ঘাসের ওপর জমে থাকে। কিন্তু সাধারণত শিশির তৈরি হয় অন্যভাবে। বাতাসে সব সময়ই কিছু পরিমাণ জলীয় বাষ্প থাকে। দিনের বেলা সূর্যের তাপে মাটি, গাছপালা ও আশপাশের পরিবেশ উষ্ণ থাকে। কিন্তু রাত নামার পর সূর্যের আলো আর থাকে না। তখন ঘাস, মাটি ও অন্যান্য বস্তু ধীরে ধীরে তাপ হারাতে শুরু করে। বিশেষ করে পরিষ্কার আকাশের রাতে কোনো কোনো পৃষ্ঠ আশপাশের বাতাসের তুলনায় বেশি ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। সেই পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যখন বাতাসের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার উপযুক্ত সীমায় পৌঁছে যায়, তখন বাষ্প পানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ঘনীভবন। আর এভাবেই তৈরি হয় শিশির।
এখন প্রশ্ন হলো, ঘাসের ওপরই এই ঘটনা বেশি চোখে পড়ে কেন? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ঘাসের পাতার আকার ও বৈশিষ্ট্য। ঘাসের প্রতিটি পাতা বেশ সরু, পাতলা এবং চারপাশের বাতাসের সংস্পর্শে উন্মুক্ত থাকে। রাতের বেলা এই পাতাগুলো তাপ বিকিরণের মাধ্যমে দ্রুত ঠান্ডা হতে পারে। ঘাসের পাতায় জমে থাকা তাপের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম। ফলে উপযুক্ত পরিবেশে পাতার তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কে পৌঁছাতে পারে, এমনকি কখনো কখনো আশপাশের বাতাসের তাপমাত্রার চেয়েও কম হতে পারে। তখন বাতাসের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা পাতার সংস্পর্শে এসে পানির বিন্দু তৈরি করে। এ কারণেই ভোরবেলা ঘাসের ডগায় শিশিরের উপস্থিতি এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
অন্যদিকে, পাশের মাটি, ইট কিংবা কংক্রিটের বৈশিষ্ট্য ঘাসের পাতার মতো নয়। এসব পদার্থের তাপ ধারণ ও তাপ ছাড়ার ক্ষমতা আলাদা। দিনের বেলা সূর্যের আলোতে কোনো কোনো শক্ত পৃষ্ঠ যথেষ্ট তাপ শোষণ করে, আর রাতের বেলা সেই তাপ ধীরে ধীরে পরিবেশে ছেড়ে দেয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে ওই পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ঘাসের পাতার মতো দ্রুত শিশিরাঙ্কের নিচে নামতে পারে না। তখন সেখানে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। তবে মনে রাখতে হবে, সব মাটি, পাথর কিংবা কংক্রিটের আচরণ এক নয়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে, বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এবং পৃষ্ঠ যথেষ্ট ঠান্ডা হলে এসব জায়গাতেও শিশির জমতে পারে।
আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো বাতাসের আর্দ্রতা। বাতাসে জলীয় বাষ্প যত বেশি থাকে, শিশির তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও সাধারণত তত বেশি হয়। ধরুন, রাতের বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প রয়েছে। ঘাসের পাতার তাপমাত্রা কমতে কমতে যখন শিশিরাঙ্কে পৌঁছাবে, তখন বাষ্প পানির বিন্দুতে পরিণত হতে শুরু করবে। কিন্তু বাতাস যদি খুব শুষ্ক হয়, তাহলে ঘাস ঠান্ডা হলেও দৃশ্যমান শিশির তৈরি হওয়ার মতো পর্যাপ্ত জলীয় বাষ্প নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ, শুধু ঠান্ডা হলেই শিশির জমে না; প্রয়োজন উপযুক্ত তাপমাত্রা এবং বাতাসে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা।
শিশির জমার ক্ষেত্রে আকাশের অবস্থাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কার রাতে ঘাস ও অন্যান্য পৃষ্ঠ থেকে তাপ বিকিরণের মাধ্যমে মহাশূন্যের দিকে শক্তি বেরিয়ে যেতে পারে। মেঘ থাকলে সেই বিকিরণের একটি অংশ আবার নিচের দিকে ফিরে আসে। ফলে মেঘলা রাতে অনেক সময় ঘাসের পাতা ততটা ঠান্ডা হতে পারে না, যতটা পরিষ্কার রাতে হয়। এ কারণেই পরিষ্কার ও শান্ত শীতের রাতে শিশির বেশি দেখা যেতে পারে। তবে আর্দ্রতা, বাতাসের গতি এবং স্থানীয় পরিবেশের পার্থক্যের কারণে সব রাতের ফলাফল এক রকম হয় না।
বাতাসের গতিও এই প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। বাতাস একেবারে স্থির থাকলে মাটির কাছাকাছি ঠান্ডা ও আর্দ্র বাতাস জমে থাকতে পারে। এতে ঘাসের পাতায় শিশির তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে। আবার বাতাস খুব বেশি জোরে বইলে আশপাশের উষ্ণ বাতাসের সঙ্গে মিশ্রণ বাড়ে। এতে পাতার তাপমাত্রা এবং তার চারপাশের বাতাসের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। ফলে শিশির তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অবশ্য পরিস্থিতিভেদে হালকা বাতাস কখনো কখনো জলীয় বাষ্প সরবরাহ করতেও সাহায্য করতে পারে।
এখানে আরও একটি মজার বিষয় রয়েছে। ঘাসের ওপর শিশির জমলেও সব জায়গায় পানির বিন্দু একই আকারের হয় না। কোনো পাতায় ছোট ছোট বিন্দু দেখা যায়, আবার কোনো পাতায় কয়েকটি বিন্দু একসঙ্গে মিশে বড় হয়ে যায়। এর পেছনে পাতার পৃষ্ঠের গঠন, মোমের মতো আবরণ, পাতার কোণ এবং পানির সঙ্গে পৃষ্ঠের পারস্পরিক আকর্ষণ কাজ করে। কিছু পাতায় পানি সহজে গোল বিন্দু হয়ে থাকে, আবার কিছু পাতায় পানি ছড়িয়ে পড়ে। তাই শিশির শুধু তাপমাত্রার গল্প নয়; এর সঙ্গে উদ্ভিদের গঠন ও পৃষ্ঠের বৈশিষ্ট্যও জড়িয়ে আছে।
আর তাপমাত্রা যদি শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা বদলে যেতে পারে। তখন পানির ক্ষুদ্র বিন্দু জমে বরফে পরিণত হতে পারে, অথবা উপযুক্ত পরিবেশে জলীয় বাষ্প থেকে সরাসরি বরফের স্ফটিক তৈরি হতে পারে। আমরা তখন ঘাসের ডগায় সাদা সাদা বরফের আস্তরণ দেখতে পারি। তবে শিশির ও তুষার এক জিনিস নয়। শিশির হলো তরল পানির বিন্দু, আর তুষার বা তুষারসদৃশ আস্তরণ তৈরি হয় বরফের স্ফটিক দিয়ে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে আমাদের চোখের আড়ালে, কোনো শব্দ ছাড়াই। রাতভর ঘাস তাপ হারায়, বাতাসের জলীয় বাষ্প ঠান্ডা পাতার সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত হয়, আর ভোরের আলোয় আমরা সেই অদৃশ্য প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান ফল দেখতে পাই। প্রকৃতির এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেগুলো আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু কখনো গভীরভাবে ভাবি না।
তাই পরেরবার শীতের সকালে ঘাসের ওপর ঝলমলে শিশির দেখতে পেলে একটু থামুন। খালি পায়ে ঘাসে হাঁটার আগে শুধু ঠান্ডা পানির স্পর্শ অনুভব করবেন না, একবার ভাবুন—রাতের অন্ধকারে কত সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কাজ করে এই সৌন্দর্য তৈরি করেছে! পাশের শুকনো মাটি আর শিশিরভেজা ঘাসের পার্থক্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একই পরিবেশে থাকা দুটি বস্তুও তাদের গঠন, তাপমাত্রা এবং বৈশিষ্ট্যের কারণে ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারে। প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়; তার পেছনের কারণগুলো বুঝতে পারলেও পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কার করার আনন্দ পাওয়া যায়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

