বৃষ্টির পর রাস্তার ওপর তেল ছড়িয়ে থাকা রঙধনুর মতো রং দেখা যায় কেন?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
বৃষ্টির পর রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখনো কি দেখেছেন, কালচে ভেজা রাস্তার ওপর হঠাৎ নীল, সবুজ, হলুদ, বেগুনি, লাল—নানারকম রঙের চিকচিকে একটা আস্তরণ দেখা যাচ্ছে? দূর থেকে মনে হয় যেন রাস্তার ওপর কেউ খুব পাতলা করে রঙধনু বিছিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যেখানে সামান্য তেল বা জ্বালানির দাগ পানির সঙ্গে মিশে থাকে, সেখানে এই দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে আসলে কোনো ছোট্ট রঙধনু তৈরি হয় না। সূর্যের আলো, পানি, তেলের অতি পাতলা স্তর এবং আলোর তরঙ্গধর্মী আচরণ—এই চারটি জিনিস মিলে আমাদের চোখের সামনে এমন এক সুন্দর রঙের খেলা তৈরি করে। অর্থাৎ, রাস্তার ওপর দেখা সেই রঙিন ঝিলিক আসলে প্রকৃতির এক অসাধারণ আলোকবিজ্ঞানের প্রদর্শনী।প্রথমে ভাবুন, রাস্তার ওপর যদি সামান্য তেল পড়ে থাকে এবং তার ওপর বৃষ্টি হয়, তাহলে কী ঘটে? তেল ও পানি একে অপরের সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায় না। ফলে তেল পানির ওপর আলাদা একটি খুব পাতলা স্তর তৈরি করতে পারে। এই স্তরটি অনেক সময় এতটাই পাতলা হয় যে খালি চোখে তার পুরুত্ব বোঝাই যায় না। কিন্তু সূর্যের আলো যখন এই পাতলা তেলের স্তরের ওপর পড়ে, তখন শুরু হয় আসল খেলা। আলো তেলের স্তরের ওপর পড়ার পর তার একটি অংশ তেলের উপরের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়, আর আরেকটি অংশ তেলের ভেতরে ঢুকে নিচের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আবার উপরে ফিরে আসে।এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—আলোর হস্তক্ষেপ। আমরা সাধারণত সাদা আলোকে এক ধরনের আলো মনে করি। কিন্তু আসলে সূর্যের সাদা আলো বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অনেক রঙের আলোর সমন্বয়। লাল, কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল, বেগুনি—প্রতিটি রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা। যখন এই বিভিন্ন রঙের আলো তেলের পাতলা স্তরের ভেতর দিয়ে আলাদা পথে যাতায়াত করে এবং পরে একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন কিছু রঙের আলো একে অপরকে শক্তিশালী করে, আবার কিছু রঙের আলো একে অপরকে দুর্বল বা প্রায় বাতিল করে দেয়। এই ঘটনাকেই বলা হয় আলোর হস্তক্ষেপ।সহজভাবে বললে, তেলের স্তরটাকে আপনি যেন আলোর জন্য একটি অতি পাতলা গোলকধাঁধা ভাবতে পারেন। আলো সেখানে ঢুকে একবার ওপর থেকে, আবার একবার নিচ থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। দুই জায়গা থেকে ফিরে আসা আলোর মধ্যে সামান্য পথের পার্থক্য তৈরি হয়। সেই পার্থক্য যদি কোনো নির্দিষ্ট রঙের আলোর তরঙ্গের সঙ্গে এমনভাবে মিলে যায় যে তারা পরস্পরকে শক্তিশালী করে, তাহলে সেই রং আমাদের চোখে বেশি উজ্জ্বল দেখা যায়। অন্য কোনো রঙের ক্ষেত্রে যদি তরঙ্গগুলো এমনভাবে মিলে যায় যে তারা পরস্পরকে দুর্বল করে দেয়, তাহলে সেই রং তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। তাই এক জায়গায় নীল বা সবুজ বেশি উজ্জ্বল দেখা যেতে পারে, আবার একটু দূরে গেলেই হলুদ বা লাল বেশি চোখে পড়তে পারে।এ কারণেই তেলের দাগের ওপর দেখা রংগুলো স্থির থাকে না। আপনি এক পা সামনে গেলেন, মাথাটা একটু অন্যদিকে ঘোরালেন, অথবা সূর্যের অবস্থান সামান্য বদলাল—রঙের বিন্যাসও বদলে যেতে পারে। কারণ আলো কোন কোণে তেলের স্তরে পড়ছে এবং কোন কোণে আমাদের চোখে ফিরে আসছে, তার ওপর নির্ভর করে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো বেশি শক্তিশালীভাবে আমাদের চোখে পৌঁছাবে। তাই রাস্তার ওপর সেই রঙিন দাগকে এক জায়গায় স্থির কোনো রঙের প্যাচ না ভেবে বরং আলো ও পাতলা স্তরের একটি পরিবর্তনশীল খেলা হিসেবে দেখাই বেশি ঠিক।শুধু তেলের দাগেই কিন্তু এই ধরনের ঘটনা দেখা যায় না। সাবানের বুদবুদ দেখলেও আপনি প্রায় একই ধরনের রঙের খেলা দেখতে পাবেন। একটি সাবানের বুদবুদের গায়ে থাকে অত্যন্ত পাতলা তরল স্তর। আলো সেই স্তরের ওপর পড়লে তার বিভিন্ন অংশ থেকে প্রতিফলিত আলো পরস্পরের সঙ্গে হস্তক্ষেপ করে। ফলে বুদবুদের গায়ে নীল, সবুজ, বেগুনি, হলুদসহ নানা রঙের চলমান নকশা দেখা যায়। একই ধরনের নীতির কারণেই কিছু কীটপতঙ্গের ডানায় বা কিছু পাতলা আবরণেও ঝিলমিল রঙ দেখা যেতে পারে।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। রাস্তার ওপর তেল ছড়িয়ে রঙধনুর মতো রং দেখা গেলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে সেখানে অনেক তেল জমে আছে। বরং অনেক সময় অত্যন্ত পাতলা তেলের স্তরই এই রঙিন প্রভাব তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। স্তরটি যদি খুব মোটা হয়ে যায়, তাহলে হস্তক্ষেপের নকশা ভিন্নভাবে তৈরি হতে পারে এবং রঙের সেই পরিষ্কার ঝিলিক সবসময় দেখা নাও যেতে পারে। অর্থাৎ, যে দৃশ্যটি আমাদের কাছে সবচেয়ে সুন্দর লাগে, তার পেছনে অনেক সময় থাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি স্তর।আর বৃষ্টির পর এই দৃশ্য বেশি চোখে পড়ার আরেকটি কারণ হলো পানি। শুকনো রাস্তার ওপর তেলের দাগ থাকলেও সেটি অনেক সময় তেমন চোখে পড়ে না। কিন্তু বৃষ্টির পানি রাস্তার ওপর একটি মসৃণ পৃষ্ঠ তৈরি করে। তেল সেই পানির ওপর পাতলা স্তর হিসেবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে আলো প্রতিফলিত হওয়ার জন্য একটি অপেক্ষাকৃত মসৃণ পরিবেশ তৈরি হয়। সূর্যের আলো যদি ঠিক উপযুক্ত কোণে পড়ে, তখন সেই রঙিন ঝিলিক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।মজার ব্যাপার হলো, এই পুরো দৃশ্যের মধ্যে আসলে কোনো নতুন রং তৈরি হচ্ছে না। সূর্যের আলোতে আগে থেকেই বিভিন্ন রঙের আলো উপস্থিত থাকে। তেলের পাতলা স্তর শুধু সেই আলোকে এমনভাবে প্রতিফলিত ও হস্তক্ষেপ করায় যে নির্দিষ্ট কিছু রং আমাদের চোখে বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ প্রকৃতি নতুন করে রং বানাচ্ছে না; বরং আগে থেকেই থাকা আলোকে এমনভাবে সাজিয়ে দিচ্ছে যে আমাদের চোখে সেটি রঙিন এক আশ্চর্য দৃশ্য হিসেবে ধরা পড়ছে।এই ঘটনাটি আমাদের একটা সুন্দর কথাও মনে করিয়ে দেয়—আমরা প্রতিদিন যে পৃথিবী দেখি, তার অনেক সৌন্দর্যের পেছনে এমন বিজ্ঞান লুকিয়ে থাকে যেগুলো আমরা সাধারণত খেয়ালই করি না। বৃষ্টির পর রাস্তার পাশে পড়ে থাকা সামান্য তেলের দাগকে হয়তো আমরা এড়িয়ে যাই। কিন্তু একটু থেমে তাকালে দেখা যায়, সেখানে আলো, পানি, তেল এবং পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম মিলে তৈরি করেছে ক্ষণস্থায়ী এক রঙের উৎসব।আর সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, এই রঙিন দৃশ্যের জন্য কোনো কৃত্রিম শিল্পীর প্রয়োজন নেই। সূর্য তার আলো দিচ্ছে, বৃষ্টি রাস্তার ওপর পানির স্তর তৈরি করছে, তেলের পাতলা আস্তরণ আলোর পথ বদলাচ্ছে, আর আমাদের চোখ সেই সবকিছুর ফলাফলকে রঙ হিসেবে দেখছে। কয়েক মিনিট পর সূর্যের কোণ বদলে যেতে পারে, পানি শুকিয়ে যেতে পারে, গাড়ির চাকা সেই স্তর সরিয়ে দিতে পারে—আর সেই অদ্ভুত রঙের পৃথিবীটাও হারিয়ে যেতে পারে।তাই পরেরবার বৃষ্টির পর রাস্তার ওপর রঙধনুর মতো কোনো তেলতেলে ঝিলিক দেখতে পেলে শুধু “তেল পড়েছে” বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। একটু থামুন। লক্ষ্য করুন, কোন জায়গায় নীল বেশি, কোথায় সবুজ, কোথায় আবার হলুদ বা বেগুনি। আপনি আসলে রাস্তার ওপর কোনো রঙধনু দেখছেন না—আপনি দেখছেন আলোর তরঙ্গ, প্রতিফলন এবং হস্তক্ষেপের এক ক্ষুদ্র কিন্তু অসাধারণ প্রদর্শনী। প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর কিছু রহস্য যে আমাদের একেবারে পায়ের নিচেই লুকিয়ে থাকতে পারে, এই দৃশ্যটি তারই একটি চমৎকার উদাহরণ।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR


This post has been upvoted by @italygame witness curation trail
If you like our work and want to support us, please consider to approve our witness
Come and visit Italy Community