কেন আমরা ঘুমানোর ঠিক আগে অদ্ভুত সব চিন্তা করতে শুরু করি?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
সারাদিন কত কিছুই না করি আমরা। ঘুম থেকে ওঠার পর ফোন দেখা, পড়াশোনা, কাজ, মানুষের সঙ্গে কথা বলা, বাইরে যাওয়া, নানা দায়িত্ব সামলানো—সব মিলিয়ে মাথার ভেতর যেন একটানা ব্যস্ততা চলতেই থাকে। তখন অনেক চিন্তা করার ইচ্ছা থাকলেও সময় থাকে না। কিন্তু রাতের বেলা যখন বিছানায় শুয়ে পড়ি, চারপাশ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়, ফোনটা এক পাশে রাখা হয়, দিনের সব শব্দ থেমে যায়—ঠিক তখনই মস্তিষ্ক যেন হঠাৎ বলে ওঠে, “এবার একটু কথা বলা যাক!” আর তখনই শুরু হয় অদ্ভুত সব চিন্তা। কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটি ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করেছিল, সে হঠাৎ ভাবতে শুরু করে—“পাঁচ বছর আগে ওই কথাটা কেন বলেছিলাম?”, “কাল যদি এমন কিছু ঘটে?”, “আমি ভবিষ্যতে কী করব?”, “ওই মানুষটা আমার কথাটা কীভাবে নিয়েছিল?”, এমনকি কখনো এমন প্রশ্নও মাথায় আসে যার কোনো প্রয়োজনই নেই—“মাছেরা কি ঘুমায়?”, “আমি যদি অন্য কোনো শহরে জন্মাতাম তাহলে জীবনটা কেমন হতো?” মজার ব্যাপার হলো, এসব চিন্তা দিনের বেলায় খুব একটা আসে না। তাহলে রাত হলেই আমাদের মস্তিষ্ক এমন অদ্ভুত হয়ে যায় কেন?আসলে মস্তিষ্ক রাতের বেলায় হঠাৎ অদ্ভুত হয়ে যায় না। বরং দিনের বেলায় যে চিন্তাগুলো করার সুযোগ আমরা পাই না, নীরব পরিবেশে সেগুলোই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সারাদিন বাইরের পৃথিবী আমাদের মনোযোগ দখল করে রাখে। কারও সঙ্গে কথা বলা, কোনো কাজ করা, শব্দ শোনা, কিছু দেখা—এসবের কারণে মস্তিষ্ককে ক্রমাগত বাইরের তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয়। ফলে নিজের ভেতরের চিন্তাগুলো অনেক সময় পেছনে পড়ে থাকে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে যখন বাইরের উদ্দীপনা কমে যায়, তখন মস্তিষ্কের ভেতরের কথাবার্তা আমাদের কাছে বেশি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।এই সময় আমরা অনেকটা নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনে ঢুকে পড়ি। দিনের কোনো অসমাপ্ত ঘটনা মনে পড়ে যায়। কারও বলা একটি কথা হঠাৎ মনে পড়ে যায়। কোনো পুরোনো স্মৃতি সামনে চলে আসে। ভবিষ্যতের কোনো সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা শুরু হয়। কখনো কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে মস্তিষ্ক এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায় চলে যায়। একটি ছোট ঘটনা থেকে শুরু হয়ে চিন্তার পথ এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে পৌঁছানোর কথা আপনি নিজেও ভাবেননি। আর তখন মনে হয়, “এতক্ষণ এসব কোথায় ছিল?”এর একটি বড় কারণ হলো দিনের ব্যস্ততার মধ্যে আমরা অনেক আবেগকে পুরোপুরি প্রক্রিয়া করার সময় পাই না। দিনের কোনো ঘটনায় হয়তো মন খারাপ হয়েছে, কিন্তু তখন কাজ ছিল বলে বিষয়টা নিয়ে ভাবিনি। কারও কথায় কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে অন্য কাজে চলে গেছি। কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধা ছিল, কিন্তু সময়ের অভাবে সেটাকে পাশে সরিয়ে রেখেছি। রাতে যখন চারপাশ শান্ত হয়, তখন সেই অসমাপ্ত অনুভূতিগুলো আবার মনের সামনে চলে আসতে পারে। মস্তিষ্ক তখন দিনের ঘটনাগুলোকে সাজাতে, মূল্যায়ন করতে এবং বিভিন্ন স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে থাকে।আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, ঘুমানোর আগে আমাদের চিন্তার ধরনও ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। আমরা পুরোপুরি জেগে থাকা অবস্থার মতো বাইরের পৃথিবীর প্রতি মনোযোগী থাকি না। ঘুমের দিকে এগোতে থাকলে সচেতন মন কিছুটা শিথিল হয়। তখন চিন্তাগুলো কখনো বেশি স্বাধীনভাবে এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যেতে পারে। একটি স্মৃতি থেকে একটি কল্পনা, কল্পনা থেকে ভবিষ্যতের কোনো দৃশ্য, সেখান থেকে আবার বহু পুরোনো কোনো ঘটনা—সবকিছু যেন অদ্ভুতভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে।এই সময়ের চিন্তাগুলো সবসময় যে খারাপ বা নেতিবাচক হয়, তা কিন্তু নয়। অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমানোর আগে সৃজনশীল চিন্তাও বেড়ে যায়। কোনো গল্পের ধারণা, নতুন কোনো পরিকল্পনা, ছবি আঁকার ভাবনা, কোনো সমস্যার অপ্রত্যাশিত সমাধান—এসবও হঠাৎ মাথায় আসতে পারে। কারণ মস্তিষ্ক যখন বাইরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা মুক্ত থাকে, তখন বিভিন্ন তথ্য ও স্মৃতির মধ্যে নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। তাই রাতের নীরবতা কখনো চিন্তার বোঝা বাড়ায়, আবার কখনো সৃজনশীলতার দরজাও খুলে দেয়।তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রবণতা থাকলে ঘুমের আগের সময়টা আরও কঠিন মনে হতে পারে। দিনের বেলায় আমরা কোনো চিন্তা এড়িয়ে যেতে পারি, কিন্তু রাতে পালানোর মতো ব্যস্ততা থাকে না। তখন ছোট একটি বিষয়ও অনেক বড় মনে হতে পারে। “যদি এটা না হয়?”, “যদি ভুল করি?”, “আগামীকাল কী হবে?”—এ ধরনের সম্ভাবনামূলক চিন্তা একটির পর একটি আসতে থাকে। মস্তিষ্ক মূলত সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো আগে থেকে কল্পনা করে প্রস্তুত হতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, বাস্তবে কোনো ঘটনা ঘটার আগেই তার অসংখ্য সম্ভাব্য সংস্করণ মাথায় ঘুরতে পারে।এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—রাতে মাথায় আসা প্রতিটি চিন্তা সত্যি, গুরুত্বপূর্ণ বা সমাধানযোগ্য নয়। ঘুমের ঠিক আগে মস্তিষ্কের চিন্তার জগৎ অনেক সময় দিনের তুলনায় বেশি মুক্ত ও বিচ্ছিন্ন মনে হতে পারে। তাই কোনো পুরোনো ভুল মনে পড়লেই ধরে নেওয়ার দরকার নেই যে সেটি এখনই সমাধান করতে হবে। ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো ভয় মাথায় এলেই সেটি সত্যি হয়ে যাবে এমনও নয়। চিন্তা হলো মস্তিষ্কের তৈরি একটি মানসিক ঘটনা—প্রতিটি চিন্তা বাস্তবতার ঘোষণা নয়।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power
| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

