চোখ বন্ধ করেও আলো কেন কখনো কখনো দেখা যায়?
আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।
চোখ বন্ধ করলেই তো অন্ধকার দেখার কথা। আমরা সাধারণত মনে করি, চোখের পাতা নামিয়ে দিলেই বাইরের পৃথিবীর আলো আমাদের কাছে পৌঁছানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কখনো কি চোখ বন্ধ করার পরও হঠাৎ লালচে, সাদা, হলুদ কিংবা ঝলমলে কোনো আলোর মতো কিছু দেখতে পেয়েছেন? কখনো চোখ বন্ধ করে রোদ থেকে ঘরে ঢোকার পর চোখের সামনে অদ্ভুত আলোর দাগ ভেসে থাকতে দেখেছেন? আবার কখনো চোখ বন্ধ অবস্থায় চোখের ওপর হালকা চাপ পড়লে নানা ধরনের আলোর ঝিলিক দেখা যেতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—চোখ তো বন্ধ, তাহলে আলোটা আসছে কোথা থেকে? আসলে এই অভিজ্ঞতার পেছনে বাইরের আলো যেমন ভূমিকা রাখতে পারে, তেমনি আমাদের চোখ ও মস্তিষ্কের ভেতরের নিজস্ব কার্যকলাপও বড় একটি কারণ।প্রথমে একটা বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—চোখ বন্ধ করলে আমরা যে “আলো” দেখি, তার সবটাই কিন্তু বাইরে থেকে আসা আলো নয়। অনেক সময় বাইরের আলো চোখের পাতার ভেতর দিয়ে খুব সামান্য পরিমাণে প্রবেশ করতে পারে। চোখের পাতা পুরোপুরি অস্বচ্ছ কোনো দেয়াল নয়। তাই খুব উজ্জ্বল জায়গায় চোখ বন্ধ করলেও লালচে বা কমলা ধরনের আভা দেখা স্বাভাবিক। চোখের পাতার ভেতর দিয়ে আসা আলো রেটিনায় পৌঁছাতে পারে এবং আমাদের দৃষ্টিব্যবস্থা সেটার প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়।আমাদের চোখের ভেতরে রয়েছে রেটিনা, যেখানে অসংখ্য আলোকসংবেদনশীল কোষ আলো শনাক্ত করে। সাধারণভাবে আমরা ভাবি, আলো না থাকলে এই কোষগুলো একেবারেই নিষ্ক্রিয় থাকবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। রেটিনা এবং এর সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুতন্ত্র সবসময়ই কিছু মাত্রায় সক্রিয় থাকে। আলো থেকে পাওয়া সংকেতের পাশাপাশি চোখের ভেতরের স্বাভাবিক বৈদ্যুতিক কার্যকলাপও মস্তিষ্কে সংকেত পাঠাতে পারে। মস্তিষ্ক সেই সংকেতকে কখনো কখনো আলো, বিন্দু, রেখা বা ঝিলিকের মতো অনুভূতি হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।এ ধরনের নিজস্ব আলোক-অনুভূতিকে অনেক সময় এমনভাবে বোঝানো যায়—আপনার দৃষ্টিব্যবস্থা শুধু বাইরের পৃথিবীর আলোকে প্রতিক্রিয়া জানায় না; ভেতরের স্নায়বিক কার্যকলাপের প্রতিও সংবেদনশীল। আমাদের চোখ ও মস্তিষ্ক একটি অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা। সেখানে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি ও আদান-প্রদান হচ্ছে। তাই চোখ বন্ধ করলেই দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্ত কার্যকলাপ হঠাৎ শূন্য হয়ে যায় না।এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো চোখের ওপর হালকা চাপ পড়লে আলোর ঝিলিক দেখা। আপনি হয়তো কখনো ঘুমানোর আগে চোখ বন্ধ অবস্থায় চোখের পাতার ওপর হাত রাখার সময় অদ্ভুত আলোর বিন্দু বা নকশা দেখেছেন। এর কারণ সাধারণত কোনো বাস্তব আলোর উৎস নয়। চোখের ওপর চাপ পড়লে রেটিনার কোষগুলো যান্ত্রিক উদ্দীপনা পেতে পারে। ফলে এমন সংকেত তৈরি হতে পারে, যা মস্তিষ্ক দৃষ্টিগত সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তখন মনে হয়, চোখের সামনে যেন আলো ঝলকে উঠল। এই ধরনের আলোক-অনুভূতিকে ফসফিন বলা হয়।সবসময় চোখের সামনে সত্যিকারের আলোর উৎস থাকা নয়। চোখ ও দৃষ্টিস্নায়ু থেকে আসা নির্দিষ্ট ধরনের সংকেত পেলেই মস্তিষ্ক সেটাকে দৃশ্যমান অনুভূতিতে রূপ দিতে পারে। অনেকটা এমন যে, মস্তিষ্কের কাছে সংকেতটাই গুরুত্বপূর্ণ—সেই সংকেত ঠিক কোথা থেকে এসেছে, সেটা সবসময় একই রকম নয়।চোখ বন্ধ করার পর কখনো কখনো যে লালচে বা কমলা আভা দেখা যায়, সেটার পেছনে আবার একটু ভিন্ন বিষয় কাজ করে। ধরুন, আপনি উজ্জ্বল রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করলেন। চোখের পাতার ভেতর দিয়ে কিছু আলো প্রবেশ করতে পারে। আমাদের চোখের পাতার নিচে রক্তনালির উপস্থিতিও রয়েছে। ফলে সেই আলো যখন চোখের পাতার টিস্যুর মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে চোখে পৌঁছায়, তখন তার রং ও তীব্রতা খোলা চোখে দেখা আলোর মতো থাকে না। তাই চোখ বন্ধ অবস্থায় বাইরের উজ্জ্বল আলো অনেক সময় লালচে বা কমলা আভা হিসেবে অনুভূত হতে পারে।আরেকটি চমৎকার বিষয় হলো, আপনি যদি কিছুক্ষণ উজ্জ্বল কোনো জায়গার দিকে তাকিয়ে থাকার পর চোখ বন্ধ করেন, তখনও সেই দৃশ্যের কিছু অংশ যেন চোখের সামনে ভেসে থাকতে পারে। এটাকে বলা হয় পর-ছবি। ধরুন, আপনি কিছুক্ষণ উজ্জ্বল কোনো বস্তু দেখলেন, তারপর চোখ বন্ধ করলেন। তখন চোখের আলোকসংবেদনশীল কোষগুলোর প্রতিক্রিয়া সঙ্গে সঙ্গে আগের অবস্থায় ফিরে যায় না। ফলে কিছু সময়ের জন্য আগের দৃশ্যের উল্টো বা পরিবর্তিত রঙের মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে। মনে হতে পারে, চোখ বন্ধ থাকার পরও সেই দৃশ্যটি আপনার সঙ্গে রয়ে গেছে।এখানে মস্তিষ্কের ভূমিকা আবারও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চোখ দিয়ে শুধু ছবি সংগ্রহ করি না; মস্তিষ্ক সেই সংকেতের অর্থ তৈরি করে। চোখ বন্ধ করার পর বাইরের দৃশ্যের তথ্য কমে গেলে মস্তিষ্কের কাছে আসা সংকেতও পরিবর্তিত হয়। তখন নিজের ভেতরের স্নায়বিক কার্যকলাপ, আগের দৃশ্যের অবশিষ্ট প্রভাব এবং চোখের ক্ষুদ্র সংকেত মিলিয়ে কখনো কখনো অদ্ভুত আলোর নকশা বা ঝিলিকের অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এজন্য চোখ বন্ধ করেও সবসময় সম্পূর্ণ কালো পর্দা দেখা যায় না।মজার ব্যাপার হলো, চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ স্থির থাকলে অনেকেই ছোট ছোট বিন্দু, ঢেউ, মেঘের মতো আকার কিংবা নড়াচড়া করা অস্পষ্ট নকশা দেখতে পান। এগুলো সাধারণত কোনো বাস্তব বস্তু নয়। আমাদের দৃষ্টিব্যবস্থার স্বাভাবিক স্নায়বিক কার্যকলাপের ফলেও এমন অনুভূতি তৈরি হতে পারে। অন্ধকার যত বেশি গভীর হয়, বাইরের দৃশ্যের তথ্য তত কমে যায়, ফলে এই ক্ষুদ্র ভেতরের সংকেতগুলো আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতায় তুলনামূলকভাবে বেশি লক্ষণীয় হতে পারে।তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করলে আলো বা ঝিলিক দেখা স্বাভাবিক হতে পারে, বিশেষ করে চোখে চাপ পড়লে বা উজ্জ্বল আলো দেখার পর। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির বারবার অকারণে নতুন ধরনের আলোর ঝলকানি, প্রচুর ভাসমান দাগ বা দৃষ্টির পরিবর্তন হতে থাকে, বিশেষ করে হঠাৎ করে শুরু হলে, তাহলে সেটিকে শুধু স্বাভাবিক ঘটনা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। চোখের কিছু সমস্যার সঙ্গেও এমন উপসর্গ যুক্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে চোখের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া নিরাপদ।সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ছোট্ট ঘটনাটি আমাদের দেখার ব্যাপারেই একটি বড় সত্য শেখায়। আমরা অনেক সময় ভাবি, বাইরে কোনো বস্তু থেকে আলো চোখে এসে পড়লেই আমরা সেটাকে দেখি। কিন্তু বাস্তবে “দেখা” হলো চোখ ও মস্তিষ্কের সম্মিলিত কাজ। কখনো বাইরের আলো থেকে সংকেত আসে, কখনো চোখের ভেতরের উদ্দীপনা থেকেও সংকেত তৈরি হতে পারে, আবার কখনো আগের দৃশ্যের প্রভাব কিছু সময় থেকে যেতে পারে। মস্তিষ্ক সেই সব সংকেতকে একত্র করে আমাদের কাছে একটি দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা তৈরি করে।তাই চোখ বন্ধ করার পর যদি কখনো হঠাৎ অদ্ভুত কোনো আলোর ঝিলিক দেখতে পান, অবাক হওয়ার কিছু নেই। আপনার চোখ হয়তো বাইরের আলোকে ভেতরে আসতে দিচ্ছে, অথবা আপনার দৃষ্টিস্নায়ু ও রেটিনার নিজস্ব কার্যকলাপ কোনো সংকেত তৈরি করছে। আর আপনার মস্তিষ্ক সেই সংকেতকে “আলো” হিসেবে অনুভব করছে।আমাদের শরীরের সবচেয়ে সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্যেও যে এত অসাধারণ বিজ্ঞান লুকিয়ে থাকতে পারে, এই ঘটনাটি তারই একটি সুন্দর উদাহরণ। আমরা ভাবি চোখ বন্ধ মানেই পৃথিবীর দৃশ্য বন্ধ। কিন্তু বাস্তবে চোখ বন্ধ করলেও দৃষ্টিব্যবস্থা পুরোপুরি নীরব হয়ে যায় না। বাইরে আলো থাকুক বা না থাকুক, চোখ ও মস্তিষ্কের ভেতরে তখনও এক অদৃশ্য জগতের কার্যকলাপ চলতে থাকে।হয়তো এ কারণেই সম্পূর্ণ অন্ধকারও সবসময় পুরোপুরি কালো মনে হয় না। কখনো সেখানে থাকে ক্ষীণ আলো, কখনো ঝিলিক, কখনো অদ্ভুত নকশা। আর সেই দৃশ্যের উৎস হয়তো বাইরের কোনো বাতি নয়—আপনার নিজের চোখ এবং মস্তিষ্ক।
সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।


| 250 SP | 500 SP | 1000 SP | 2000 SP | 5000 SP |
VOTE @bangla.witness as witness

OR

