আমরা কি চোখ দিয়ে দেখি, নাকি আসলে মস্তিষ্ক দিয়েই দেখি?

in আমার বাংলা ব্লগ10 days ago

আসসালামু-আলাইকুম। আদাব - নমস্কার। মাতৃভাষা বাংলা ব্লগিং এর একমাত্র কমিউনিটি আমার বাংলা ব্লগ এর ভারতীয় এবং বাংলাদেশী সদস্যগণ, আশা করি সবাই ভাল আছেন।



আমরা ছোটবেলা থেকেই জানি—চোখ দিয়ে আমরা দেখি। চোখ বন্ধ করলে পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়, আবার চোখ খুললেই চারপাশের মানুষ, গাছ, আকাশ, রাস্তা, রং—সবকিছু দেখতে পাই। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়, চোখই বুঝি দেখার মূল কাজটি করে। কিন্তু বিজ্ঞান একটু অন্যরকম গল্প বলে। চোখ অবশ্যই দেখার জন্য অপরিহার্য, কিন্তু চোখ একা আসলে “দেখে” না। চোখ বাইরের পৃথিবী থেকে আলো ও তথ্য সংগ্রহ করে, আর সেই তথ্যকে অর্থপূর্ণ দৃশ্যে পরিণত করে আমাদের মস্তিষ্ক। অর্থাৎ আমরা চোখ দিয়ে আলো গ্রহণ করি, কিন্তু সেই আলোর অর্থ বুঝে পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা তৈরি করি মস্তিষ্কের মাধ্যমে।ধরুন, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। সামনে একজন পরিচিত মানুষকে দেখতে পেলেন। আপনার কাছে পুরো ঘটনাটি ঘটে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই। আপনি তাকে দেখলেন, চিনলেন, বুঝলেন তিনি আপনার পরিচিত এবং হয়তো তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে এটাও আন্দাজ করলেন তিনি খুশি নাকি চিন্তিত। কিন্তু এই ছোট্ট সময়ের মধ্যে আপনার শরীরের ভেতরে অসাধারণ একটি প্রক্রিয়া ঘটে যায়। সেই ব্যক্তির শরীর থেকে প্রতিফলিত আলো আপনার চোখে প্রবেশ করে। চোখের ভেতরের রেটিনা সেই আলোকতথ্যকে স্নায়বিক সংকেতে রূপান্তর করে। সংকেত স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এরপর মস্তিষ্ক সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে আকার, রং, গতি, দূরত্ব এবং মুখের বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে। তারপর স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে বলে—“এই মানুষটিকে আমি চিনি।” আমরা শুধু “দেখলাম” বলে অনুভব করি, কিন্তু ভেতরে তখন বিশাল এক হিসাব চলছে।আর এখানেই বিষয়টি আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে। আমাদের মস্তিষ্ক শুধু চোখ থেকে আসা তথ্যের অপেক্ষায় বসে থাকে না। অনেক সময় তথ্য অসম্পূর্ণ হলেও মস্তিষ্ক নিজের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে দৃশ্যের বাকি অংশ অনুমান করে নেয়। অন্ধকার ঘরে দূরে কোনো অস্পষ্ট আকৃতি দেখলে সেটাকে মানুষ মনে হতে পারে। একটু কাছে গিয়ে দেখা গেল, সেটি আসলে একটি চেয়ার বা কাপড় ঝোলানোর স্ট্যান্ড। চোখ আপনাকে ইচ্ছা করে ভুল দেখায়নি। আলো কম থাকায় তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল। সেই অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে মস্তিষ্ক দ্রুত একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা তৈরি করেছিল।এই কারণেই অনেক সময় আমরা চোখের সামনে থাকা জিনিসও দেখতে পাই না। আপনি হয়তো ঘরে বসে একটি নির্দিষ্ট জিনিস খুঁজছেন। জিনিসটি আপনার সামনেই আছে, অথচ কয়েকবার তাকিয়েও খুঁজে পাচ্ছেন না। হঠাৎ অন্য কেউ দেখিয়ে দিলে মনে হয়, “আরে! এটা তো এখানেই ছিল!” আসলে চোখ তখনও সেই বস্তুটির আলো গ্রহণ করছিল। কিন্তু আপনার মনোযোগ অন্য জায়গায় ছিল বলে মস্তিষ্ক সেই তথ্যকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়নি। অর্থাৎ চোখে পড়া আর মস্তিষ্কের কাছে কোনো বিষয় “গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা”—দুটি এক জিনিস নয়।আমাদের মস্তিষ্কের এই ক্ষমতা বোঝার জন্য দৃষ্টিভ্রম বা চোখের ধাঁধা খুব ভালো উদাহরণ। কিছু ছবিতে দুটি সমান আকারের রেখা আমাদের কাছে অসমান মনে হয়। কোনো স্থির ছবি নড়ছে বলে মনে হয়। আবার একই রং আশেপাশের পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে ভিন্ন রকম দেখাতে পারে। এখানে চোখ আলো ও রঙের তথ্য পাঠাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মস্তিষ্ক সেই তথ্যের সঙ্গে চারপাশের পরিবেশ, আলো-ছায়া, পূর্বের অভিজ্ঞতা এবং পরিচিত নকশা মিলিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তাই আমরা সবসময় ক্যামেরার মতো নিরপেক্ষভাবে পৃথিবীকে দেখি না; বরং মস্তিষ্কের ব্যাখ্যা করা পৃথিবী দেখি।আমাদের স্মৃতিও দেখার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। একজন ছোট শিশু কোনো অপরিচিত যন্ত্র দেখে শুধু অদ্ভুত একটি বস্তু দেখতে পারে। কিন্তু একই জিনিস একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি দেখলে তার ব্যবহার, গঠন বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনেক কিছু বুঝে ফেলতে পারেন। কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তির মস্তিষ্কের কাছে আগে থেকেই সেই জিনিস সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ চোখ একই রকম দৃশ্য গ্রহণ করলেও মস্তিষ্কের পূর্বের জ্ঞান ভিন্ন হওয়ায় দেখার অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।এমনকি পরিচিত মানুষের মুখ দেখার ক্ষেত্রেও আমাদের মস্তিষ্ক অসাধারণ দ্রুত কাজ করে। ভিড়ের মধ্যে শত শত মুখের মাঝেও পরিচিত কারও মুখ হঠাৎ চোখে পড়ে যায়। কারণ মস্তিষ্ক মুখের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, আকৃতি এবং স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা করে। আমরা তখন আলাদা করে বসে মুখের প্রতিটি অংশ বিশ্লেষণ করি না। মস্তিষ্ক প্রায় মুহূর্তের মধ্যেই সিদ্ধান্ত তৈরি করে ফেলে।আরেকটি আশ্চর্য ব্যাপার হলো, আমাদের চোখের দৃষ্টিক্ষেত্রেও এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে সরাসরি আলোকতথ্য পাওয়া যায় না। চোখ থেকে মস্তিষ্কে তথ্য বহনকারী স্নায়ু রেটিনা থেকে বের হওয়ার জায়গায় আলোকসংবেদনশীল কোষের স্বাভাবিক ব্যবস্থা থাকে না। তবুও আমরা প্রতিদিন পৃথিবীকে কোনো অদ্ভুত ফাঁকা জায়গা নিয়ে দেখি না। কারণ মস্তিষ্ক আশেপাশের তথ্য ব্যবহার করে সেই অংশের একটি ধারাবাহিক ধারণা তৈরি করে নেয়। আমরা বুঝতেই পারি না যে আমাদের দেখা দৃশ্যের কিছু অংশ আসলে মস্তিষ্কের তৈরি একটি পূরণ করা ব্যাখ্যা।তাহলে কি আমরা বাস্তব পৃথিবী দেখি না? বিষয়টি এমন নয়। বাইরের পৃথিবী অবশ্যই বাস্তব। আলো, বস্তু, রং, আকার, দূরত্ব—এসবের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনো “লাইভ সংযোগ” নেই। আমাদের ইন্দ্রিয়গুলো বাইরের জগতের তথ্য সংগ্রহ করে, সেই তথ্য স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়, আর মস্তিষ্ক সেই তথ্যকে সাজিয়ে আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতা তৈরি করে। তাই আমরা যে পৃথিবী দেখি, সেটি বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের তৈরি একটি ব্যাখ্যার সমন্বয়।এই কারণেই একই ঘটনা নিয়ে মানুষের দেখার অভিজ্ঞতা কখনো কখনো আলাদা হতে পারে। কেউ কোনো দৃশ্যের একটি অংশে বেশি মনোযোগ দিতে পারে, কেউ অন্য অংশে। কারও আগের অভিজ্ঞতা একরকম, অন্যজনের অন্যরকম। কারও প্রত্যাশা একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের দিকে তাকে নিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আমরা শুধু চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখি না; আমরা আমাদের মস্তিষ্ক, স্মৃতি, মনোযোগ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও পৃথিবীকে দেখি।সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো, এই পুরো ব্যবস্থাটি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে এত তথ্য রয়েছে যে প্রতিটি তথ্য সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। তাই মস্তিষ্ক দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় কোন জিনিস গুরুত্বপূর্ণ, কোনটা উপেক্ষা করা যায়, কোথায় মনোযোগ দেওয়া দরকার এবং কোন পরিবর্তনটি আমাদের জন্য অর্থপূর্ণ। এই দ্রুত ব্যাখ্যা করার ক্ষমতাই আমাদের চারপাশের বিশাল জগতের মধ্যে পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করে।তাই পরেরবার যখন আয়নায় নিজের মুখ দেখবেন, আকাশের দিকে তাকাবেন, কোনো প্রিয় মানুষের মুখ চিনবেন কিংবা ব্যস্ত রাস্তায় হাঁটবেন, একবার থেমে ভাবুন—“আমি আসলে কীভাবে দেখছি?” উত্তরটি শুধু “চোখ দিয়ে” নয়। চোখ পৃথিবী থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে, কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ তৈরি করছে মস্তিষ্ক। চোখ যেন পৃথিবীর দরজা, আর মস্তিষ্ক সেই দরজা দিয়ে আসা তথ্যের গল্পকার।

সকলকে ধন্যবাদ অনুচ্ছেদ টি পড়ার জন্য।

1000038736.webp


Support @heroism Initiative by Delegating your Steem Power

250 SP500 SP1000 SP2000 SP5000 SP

Heroism_3rd.png

VOTE @bangla.witness as witness


witness_vote.png

OR

SET @rme as your proxy

witness_proxy_vote.png